কর্ণফুলীতে ধান ছেড়ে ঘাস চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

সেচসংকট, জোয়ারের পানিতে জমি প্লাবিত হওয়া, জলাবদ্ধতা ও কৃষিশ্রমিকের বাড়তি মজুরির কারণে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় ধান চাষ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। উৎপাদন খরচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আয় না বাড়ায় বিকল্প ফসল হিসেবে উন্নত জাতের পশুখাদ্য ঘাস চাষে আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকেরা। পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য সংরক্ষণে সাইলেজ প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
কেউ নিজেদের ডেইরি খামারের পশুখাদ্যের চাহিদা মেটাতে জমিতে ঘাস চাষ করছেন, আবার কেউ খামারিদের কাছে জমি ইজারা দিচ্ছেন। কৃষকদের দাবি, ধান চাষের তুলনায় ঘাস আবাদে বছরে প্রায় তিন গুণ বেশি লাভ পাওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ববিল, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কালারপোল থেকে বেল্লাপাড়া সেতু এলাকা এবং ৬, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজবাজারের পশ্চিমাংশ থেকে জুলধা পর্যন্ত ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ কৃষিজমিতে ঘাসের আবাদ হয়েছে। উপজেলার অন্যান্য ইউনিয়নেও একই প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। চরলক্ষ্যা, জুলধা ও বড়উঠানের কিছু জমিতে এখনো ধান চাষ হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে ঘাসের আবাদ। দূর থেকে সবুজ মাঠগুলো ধানক্ষেত মনে হলেও কাছে গেলে দেখা যায়, সেখানে চাষ হয়েছে পশুখাদ্যের ঘাস।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এক বিঘা জমিতে ব্রি-২৮ বা ব্রি-২৯ জাতের ধান চাষ করে বছরে সর্বোচ্চ ২০ মণ পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। তবে চারা, সার, সেচ ও শ্রমিকের খরচ মেটাতে গিয়ে কৃষকদের লাভের পরিমাণ কমে আসে। অন্যদিকে, একবার ঘাসের চারা রোপণ করলে বছরে পাঁচ থেকে ছয়বার পর্যন্ত ঘাস কেটে বিক্রি করা যায়। প্রথমবার কাটার পর জমিতে আবারও ঘাস জন্মায়, ফলে প্রতিবার নতুন করে চারা রোপণের প্রয়োজন হয় না। তবে দীর্ঘদিন ঘাস চাষের পর একই জমিতে আবার ধান আবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে বলে জানিয়েছেন কৃষকেরা।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
উপজেলায় কয়েক শ গরুর খামারে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজারের বেশি গবাদিপশু রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব খামারের খাদ্য চাহিদা পূরণে কৃষক ও খামারিরা অর্ধশতাধিক একর জমিতে উন্নত জাতের নেপিয়ার ঘাস চাষ করছেন।
কৃষকদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে ঘাস চাষে চারা কিনতে প্রায় দুই হাজার টাকা, শ্রমিকের মজুরিতে দুই হাজার টাকা এবং ২০ কেজি ইউরিয়া সারে প্রায় ৮০০ টাকা খরচ হয়। গো-খাদ্যের বাজারে দাম বাড়তে থাকায় তুলনামূলক কম খরচে উৎপাদিত ঘাস খামারিদের ব্যয় কমাতে সহায়তা করছে। এ কারণে মূল আবাদি জমির পাশাপাশি পতিত জমি, সড়কের পাশ ও ডোবা-নালার পাড়েও ঘাস চাষ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ঘাসের আবাদ বাড়ার প্রভাব পড়ছে শীতকালীন শাকসবজি উৎপাদনেও। আগে যেসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ হতো, সেসব এলাকার কিছু জমিতেও এখন ঘাসের আবাদ দেখা যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় কৃষিতে ফসলের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কর্ণফুলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুল হক বলেন, কর্ণফুলী উপজেলা দেশের দ্বিতীয় ডেইরি জোনে পরিণত হয়েছে। এখানকার অনেক কৃষক ও খামারি গবাদিপশুর খাদ্য চাহিদা মেটাতে ঘাস চাষের দিকে ঝুঁকছেন।
তিনি আরও জানান, উপজেলায় ১ হাজার ৩৮১ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ৪ হাজার ১১৩ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ধানের পাশাপাশি শাকসবজি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের বীজ, সার ও কীটনাশক দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ অর্জিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।








