Logo

পর্যাপ্ত সার মজুতেও কেন ভোগান্তির শিকার কৃষক?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৪ নভেম্বর, ২০২৬, ২০:০৮
পর্যাপ্ত সার মজুতেও কেন ভোগান্তির শিকার কৃষক?
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

দেশে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি মিলিয়ে মোট ৫৮ দশমিক ০৫ লাখ টন সার মজুত রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি, বর্তমানে দেশের কোথাও সারের সংকট নেই। আগামী মৌসুমেও পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সরকারি এই হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না। বরাদ্দ ও মজুত পর্যাপ্ত থাকার পরও অনেক কৃষক চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হচ্ছে, কোথাও বরাদ্দের সার অন্য জেলায় পাচারের অভিযোগ উঠেছে। আবার ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের কারণেও ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকরা।

এ অবস্থায় সার বিতরণ ব্যবস্থায় নজরদারি বাড়ানো, ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি।

গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কমিটির সভাপতি ও লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, কমিটির সদস্য এবং কৃষি মন্ত্রণালয় ও এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার কর্মকর্তারা।

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চলমান কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার পাশাপাশি সার-বীজ ব্যবস্থাপনা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, কৃষিজমি সংরক্ষণ, কীটনাশকের ব্যবহার, দেশীয় তুলা উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও রপ্তানির নানা দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের প্রতিবেদন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

মজুত পর্যাপ্ত, সংকটের পেছনে অনিয়মের অভিযোগ

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান জানান, উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলাসহ দেশের কোনো এলাকায় বর্তমানে সারের ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত মজুতের পাশাপাশি সরবরাহও স্বাভাবিক রয়েছে। গত পাঁচ বছরের তুলনায় চলতি বছর বেশি পরিমাণ সার সরবরাহ করা হয়েছে। আগামী মৌসুমেও সংকটের আশঙ্কা নেই বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে মাঠপর্যায়ে সার না পাওয়ার অভিযোগের পেছনে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন সচিব। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন সার বিতরণ নীতিমালার পরিবর্তন, ডিলারদের ব্যবসায়িক বিরোধ, কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা, খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত দামে বিক্রি, কালোবাজারে সার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং রবি মৌসুমের জন্য আগাম মজুতকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ানোর কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

সার বিতরণে শৃঙ্খলা ফেরাতে মনিটরিং কমিটি গঠনের কথাও জানান তিনি। সকাল ৯টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একটি মনিটরিং সেল কাজ করছে। দেশের ৬৪ জেলায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৬৪ জন ট্যাগ অফিসার। পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে।

দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে পাঁচজন কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। অনিয়মের দায়ে পাঁচজন ডিলারের ডিলারশিপও বাতিল করা হয়েছে বলে জানান সচিব।

বিজ্ঞাপন

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, সার ডিলার হতে হলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ওই এলাকার ভোটার হতে হবে। এ শর্ত পূরণ না করা বহিরাগত ডিলারদের পর্যায়ক্রমে বাদ দিয়ে নতুন ডিলার নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রতি বস্তা সার ১ হাজার ৭০০ টাকায় কেনার অভিযোগ

সংসদ সদস্যরা জানান, মন্ত্রণালয়ের দেওয়া মজুত ও সরবরাহের হিসাবের সঙ্গে কৃষকদের অভিজ্ঞতার পার্থক্য রয়েছে। সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, চলতি আমন মৌসুমে অনেক এলাকায় কৃষকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাননি। পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও কেন কৃষকদের কাছে সার পৌঁছাচ্ছে না, তা সরেজমিনে যাচাই করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

তিনি প্রতি বস্তা সার ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত দামে কেনার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে মনিটরিং কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে হবে। এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সার পাচার এবং কালোবাজারি বন্ধের পাশাপাশি প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সার বিক্রির সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও তদারকি নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে মনিটরিং সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নাম, পদবি ও মোবাইল নম্বর সংসদ সদস্যদের কাছে সরবরাহের আহ্বান জানান।

সদস্য গোলাম রছুল তাঁর নির্বাচনি এলাকার বাগারপাড়া উপজেলার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, সেখানে সার পর্যাপ্ত থাকলেও বিক্রি ও বিতরণে দুর্বলতা রয়েছে। বরাদ্দের সার অন্য জেলায় বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগে স্থানীয়দের সহায়তায় দুই থেকে তিনটি সারবোঝাই ট্রাক আটক করে পুলিশের কাছে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, বাগারপাড়ার ৩৭ জন ডিলারের মধ্যে প্রায় ২০ জন স্থানীয় বাসিন্দা নন। তাঁদের কেউ কেউ নিজেরা সরাসরি ব্যবসা পরিচালনা না করে অন্যদের দিয়ে ডিলারশিপ চালাচ্ছেন, আবার কেউ সাব-ডিলার নিয়োগ করছেন। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ এবং বিতরণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

সদস্য মো. রোকন উদ্দীন বাবুল বলেন, নীলফামারীর কিছু এলাকায় আগের তুলনায় কোনো কোনো মাসে ডিলারদের বরাদ্দ কম দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও সংকট তৈরি হওয়ার ঘটনা বিতরণ ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা নির্দেশ করে। নিয়মিত মাঠপর্যায়ে নজরদারির পাশাপাশি প্রকৃত ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থানীয় নাগরিকদের ডিলার নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।

কৃষক কার্ড ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পরিকল্পনা

বিজ্ঞাপন

বৈঠকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. নুরুজ্জামান মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের রূপকল্প হচ্ছে ‘টেকসই, নিরাপদ ও লাভজনক কৃষি’। উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, ফসলের বহুমুখীকরণ, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কৃষক কার্ড চালু, খাল খনন, বিএমডিএ পুনঃসচল করা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত, কৃষিজমি রক্ষা, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, সমবায় পুনরুজ্জীবিত করা এবং বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম নেওয়ার বিষয়টি সভায় জানানো হয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ ছিল ২৪ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা। প্রকল্প ক্লাস্টারিং ও রিস্কোপিংয়ের মাধ্যমে ৬১৬ কোটি ২৯ লাখ টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাও রয়েছে।

সার ব্যবস্থাপনায় নতুন নীতিমালা কার্যকর, ডিলার নিয়োগে নিয়ম অনুসরণ এবং ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

গদখালীতে ফুল ও মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের দাবি

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীতে ফুল ও মৃত্তিকা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন সংসদ সদস্য সাবিরা সুলতানা। তিনি বলেন, গদখালী দেশের অন্যতম পরিচিত ফুল উৎপাদন এলাকা হলেও সেখানে ফুল ও মাটি গবেষণার জন্য কোনো কেন্দ্র নেই। ফলে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা এবং ফসলভিত্তিক পরামর্শ নিতে যশোর শহরে যেতে হয়। এতে বিশেষ করে স্বল্প আয়ের কৃষকদের বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে।

এ সমস্যা সমাধানে গদখালীতে গবেষণাগার ও পরীক্ষার সুবিধা স্থাপনের দাবি জানান তিনি।

সাবিরা সুলতানা আরও বলেন, যশোরে তুলা চাষের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার ২০ হাজার ৫০০ জনকে ২০ কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সরকার ১২৬ কোটি টাকা লাভবান হয়েছে। ফুল ও তুলা পর্যায়ক্রমে চাষ করা গেলে কৃষকদের আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলেও মত দেন তিনি।

এ ছাড়া কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ায় উর্বরতা কমে যাওয়া, কৃষিতে কীটনাশক ও খাদ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারের সঙ্গে ক্যানসারের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা গবেষণার মাধ্যমে খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেন।

এ বিষয়ে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আফসার আলী জানান, যশোরে তাঁদের আঞ্চলিক গবেষণাগার ও কার্যালয় রয়েছে। মোবাইল সয়েল টেস্টিং ল্যাবের মাধ্যমে কৃষকদের মাটি পরীক্ষা এবং ফসল অনুযায়ী সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। গদখালী-ঝিকরগাছা এলাকার ফুলচাষিদের দ্রুত মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় সার ব্যবহারের সুপারিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

কৃষি সচিব জানান, গদখালীতে ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব নথিভুক্ত করা হয়েছে। ফুলচাষিদের মাটি, সার ও কীটনাশক ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত একটি অস্থায়ী মৃত্তিকা পরীক্ষা ক্যাম্প বা কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে তৈরি হচ্ছে কারিগরি কমিটির প্রতিবেদন

কৃষিপণ্যের নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের বিষয় বিবেচনায় কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ জানান সংসদ সদস্যরা। এর ক্ষতিকর প্রভাব যাচাই এবং ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে গবেষণাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুস সালাম জানান, কীটনাশক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং নীতিমালা ও নির্দেশিকা তৈরির জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে পাঁচটি সভা করেছে। কয়েক দিনের মধ্যে খসড়া প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রতিবেদনটি পরে কৃষিমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট জাতীয় কারিগরি কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, কীটনাশক ব্যবস্থাপনাকে সময়োপযোগী করতে নতুন নীতিমালা ও মানসম্মত স্পেসিফিকেশন প্রণয়ন করা হবে। কীটনাশক আমদানি ও বিক্রির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি এবং বিক্রি বন্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের নিরাপদভাবে কীটনাশক ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং সবজিতে ক্ষতিকর কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পেঁয়াজ, আদা, মরিচ ও টমেটোতে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্য

কৃষিমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে কৃষি খাতের উন্নয়ন সরাসরি সম্পর্কিত। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে প্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হবে।

পেঁয়াজ, আদা, কাঁচা মরিচ ও টমেটোর উৎপাদন বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমে রপ্তানিমুখী কৃষি গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। পেঁয়াজ সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়াতে ২৭ হাজার ৭০০টি এয়ার ফ্লো মেশিন সরবরাহ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টন পেঁয়াজ সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি পেঁয়াজ রপ্তানির উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

আদার উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদন ও চাহিদার ঘাটতি পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কাঁচা মরিচ ও টমেটোর বর্ষাকালীন উৎপাদন বাড়িয়ে এক থেকে দুই বছরের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব ফসলের বছরব্যাপী উৎপাদন বাড়াতেও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা উন্নয়নে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়ার কথা জানান কৃষিমন্ত্রী। মাটির পিএইচের উন্নতির মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও আমদানি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব এলাকায় মাটির অবস্থা দুর্বল, সেগুলোকে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় আনা হচ্ছে।

চরাঞ্চলের জমিতে সয়াবিন, বাদাম, ভুট্টা, মিষ্টি আলু ও মিষ্টি কুমড়াসহ উপযোগী ফসল উৎপাদনে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

বছরে ৪৫ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি

দেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্ব পেয়েছে। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মো. রেজাউল আমিন জানান, প্রতি বছর প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার তুলা আমদানি করতে হয়। এ নির্ভরতা কমাতে পাহাড়ি, পরিত্যক্ত ও অনাবাদি জমিতে তুলা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তামাক চাষের পরিবর্তে তুলা উৎপাদনেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।

মরিচ, হলুদ ও বিভিন্ন শাকসবজির সঙ্গে একই জমিতে তুলা চাষের কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। রাজশাহী ও নাটোরের কয়েকটি এলাকায় হলুদের সঙ্গে তুলা চাষ করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।

তাঁর মতে, তুলা চাষ মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ইতিবাচক। ভবিষ্যতে কার্বন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমেও এ খাতের কৃষকেরা আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন।

উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার ৪ হাজার ১০০ পদ শূন্য

মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনবল সংকটের বিষয়টিও বৈঠকে উঠে আসে। কৃষি সচিব জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার অনুমোদিত ১৪ হাজার ৯২টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪ হাজার ১০০টি পদ শূন্য রয়েছে।

এর মধ্যে ২ হাজার ৩৬০টি পদে নিয়োগ কার্যক্রম চলমান। বাকি শূন্যপদ পূরণের জন্য সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদা পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংসদ সদস্যরা মাঠপর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কৃষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ওপর গুরুত্ব দেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে জনবল ঘাটতি দ্রুত পূরণের দাবিও জানান তাঁরা।

বৈঠকে বিএডিসির গুদামের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং বিএডিসি ও বিএমডিএর বৈদ্যুতিক গভীর নলকূপ সৌরশক্তিচালিত করার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এ বিষয়ে দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সমীক্ষা শেষ করে কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি খাতের উন্নয়নে স্থায়ী কমিটির ১০ দফা সুপারিশ

বৈঠকে কৃষি খাতের ব্যবস্থাপনা ও কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে ১০টি সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে সার ডিলার নিয়োগে সংশ্লিষ্ট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার শর্ত কঠোরভাবে অনুসরণ এবং নীতিমালা লঙ্ঘনকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

সারের কৃত্রিম সংকট, অবৈধ মজুত ও বিতরণে অনিয়ম ঠেকাতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও এবং ডিসির নেতৃত্বে মনিটরিং জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর কীটনাশকের আমদানি ও ব্যবহার বন্ধে সময়োপযোগী নীতিমালা ও মানদণ্ড প্রণয়নের কথাও রয়েছে।

আরও পড়ুন

রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব ও প্রাকৃতিক সার উৎপাদন এবং ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএডিসির গুদামের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিএডিসি ও বিএমডিএর গভীর নলকূপ সৌরশক্তিতে রূপান্তরের সুপারিশও রয়েছে।

এ ছাড়া তুলা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় কমাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, যশোরের গদখালীতে মৃত্তিকা পরীক্ষা ক্যাম্প ও ফুল গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন এবং শূন্য উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি।

কমিটির সভাপতি মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব বিবেচনায় সার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দ্রুত প্রথম পরিচিতি ও পর্যালোচনা সভা আয়োজন করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি দপ্তর ও সংস্থার কার্যক্রম আলাদাভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

সভায় যশোরের ফুল ও সবজি চাষ, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা, কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং দেশে তুলা উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানিতে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় উৎপাদন সম্প্রসারণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কৃষি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানিয়েছে স্থায়ী কমিটি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD