Logo

চালকলের ছাই-বর্জ্যে বিপর্যস্ত জনজীবন, কমছে কৃষিজমির ফলন

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কুষ্টিয়া
২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:০৪
চালকলের ছাই-বর্জ্যে বিপর্যস্ত জনজীবন, কমছে কৃষিজমির ফলন
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগর-কবুরহাট এলাকায় চালকলের ছাই, বর্জ্য, পলিথিন ও দূষিত পানিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের কৃষিজমি ও লোকালয়ে। এতে একদিকে যেমন ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ছাই ও দূষণের কারণে দৈনন্দিন চলাচলও কঠিন হয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য।

বিজ্ঞাপন

চালকলের পরিবেশদূষণ বন্ধে মিল মালিকদের দেওয়া দুই মাসের সময়সীমা পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার শুধু নোটিশ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করা হবে না; দূষণকারী মিলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সময়সীমা পেরোলেও কমেনি দূষণ

গত ২৯ জুলাই খাজানগরের চালকলগুলোতে পরিবেশদূষণের অভিযোগে অভিযান চালায় পরিবেশ রক্ষা কমিটি। এ সময় দূষণ নিয়ন্ত্রণে মিল মালিকদের দুই মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

অভিযানে মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আল ওয়াজিউর রহমান মিল মালিকদের সতর্ক করে বলেছিলেন, এভাবে পরিবেশ দূষণ করা যাবে না। মিল মালিকদের সদিচ্ছার অভাবে যেভাবে দূষণ হচ্ছে, দুই মাস পর যেন আর এমন পরিস্থিতি দেখতে না হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও দূষণ বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। তাঁদের দাবি, চালকলের ছাই, বর্জ্য ও দূষিত পানির কারণে কৃষিজমি এবং বসতবাড়ির আশপাশের পরিবেশ ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।

ধানের ফলন কমেছে, বিপাকে কৃষক

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার খাজানগরসংলগ্ন স্বর্গপুর গ্রামের কৃষক মন্টু সাধু বলেন, চালকলের ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন, নোংরা পানি ও ছাই তাঁদের আবাদি জমিতে এসে পড়ছে। এতে জমিতে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি দাবি করেন, আগে প্রতি বিঘা জমিতে ২৫ মণ ধান পাওয়া গেলেও এখন ১০ মণও পাওয়া যাচ্ছে না।

মন্টু সাধুর অভিযোগ, মিল কর্তৃপক্ষকে সমস্যার কথা জানালে তারা বলে, ময়লা পানি ও ছাই এভাবেই যাবে। কৃষি কর্মকর্তাদের কাছেও অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর প্রতিকার পাননি তাঁরা। এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলেও মিল মালিকদের রোষানলে পড়তে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

খাজানগরের বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর কৃষি কর্মকর্তা এসে মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে একটি সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময় পার হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

বিজ্ঞাপন

ছাই-দূষণে দুর্ভোগে পরিবারগুলো

খাজানগর এলাকার গৃহবধূ শ্যামলী খাতুন বলেন, ছাই ও দূষণের কারণে সন্তানদের নিয়ে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। মিল মালিকদের সময় বেঁধে দেওয়া হলেও তা পেরিয়ে যাওয়ার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি; বরং ভোগান্তি আরও বেড়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, চালকলের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় কৃষিজমির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

নজরদারির কথা বলছে চালকল মালিক সমিতি

বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন বলেন, যেসব মিল মালিকের বিরুদ্ধে ছাই ছড়ানো ও বায়ুদূষণের অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। পরিবেশদূষণ বন্ধে তাঁদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

২৭টি মিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, দূষণকারী চালকলগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এবার কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে ২৭টি মিলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এমদাদুল হক বলেন, পরিবেশদূষণের মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে মিলগুলোকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে—অতি দূষণকারী, মধ্যম দূষণকারী, নিম্ন দূষণকারী ও গ্রহণযোগ্য। এর মধ্যে অতি দূষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

এখন দূষণ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলে কৃষিজমি রক্ষা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD