ডাকসুর ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা, নেই ফি’র হিসাব

দীর্ঘ ছয় বছর পর উৎসবমুখর পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহার বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বাজেট সংকট ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত ডাকসু ও হল সংসদ ফি’র দীর্ঘদিনের হিসাব সংক্রান্ত জটিলতা।
বিজ্ঞাপন
ডাকসু ও হল সংসদের জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বড় অংশ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৯ সালের ডাকসুতে কোনো আন্দোলন ছাড়াই দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় ১ কোটি ৮৯ লাখ টাকা বাজেট অনুমোদন হলেও, ২০২৫ সালের ডাকসুর দ্বিতীয় কার্যনির্বাহী সভায় কোনো পূর্ণাঙ্গ বাজেট অনুমোদন হয়নি।
পরবর্তীতে ডাকসু ও হল সংসদের পক্ষ থেকে ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের দেওয়া ফি’র হিসাব চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়। প্রশাসন ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আয়ের কিছু তথ্য দিতে পারলেও, ব্যয়ের হিসাব এবং ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ফি’র কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে পারেনি।
নির্বাচনের প্রায় ৫০ দিন পর, গত ৩০ অক্টোবর প্রথমবারের মতো একটি প্রাথমিক বাজেট ঘোষণা করা হয়। এতে ডাকসুর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় ২৫ লাখ টাকা এবং ১৮টি হল সংসদের জন্য প্রতিটি হলে ১ লাখ টাকা করে মোট ৪৩ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
তবে ডাকসু সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বরাদ্দ কেবল নামমাত্র; এতে ইশতেহারের অধিকাংশ কাজ বাস্তবায়ন অসম্ভব।
হল সংসদ প্রতিনিধিরা বলছেন, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক লাখ টাকা অত্যন্ত অপ্রতুল। কবি জসীম উদ্দিন হল সংসদের সহ-সভাপতি ওসমান গনি বলেন, প্রশাসন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম বাজেট দিয়েছে। বছরের পর বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া ফি যদি হল ও ডাকসুর নিজস্ব অ্যাকাউন্টে ফেরত দেওয়া হয়, তাহলে ইশতেহারের কাজগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক খালেদ হাসান জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ইতোমধ্যে হলের অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় দুই কোটি টাকার কাজ হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের দেওয়া এক লাখ টাকা দিয়ে হল সংসদের মাসিক কার্যক্রমও চালানো কঠিন।
একই ধরনের অভিযোগ তুলে স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক সাদমান আব্দুল্লাহ বলেন, বাজেট না থাকায় ইশতেহার বাস্তবায়ন কার্যত অসম্ভব। প্রশাসন যেন কেবল দায় সারার জন্য সামান্য বরাদ্দ দিয়েছে। তারা শিক্ষার্থীদের দেওয়া হল সংসদ ফি সরাসরি হল সংসদের অ্যাকাউন্টে ফেরত চান।
সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা দিয়েছে ডাকসু ও হল সংসদ ফি’র হিসাব নিয়ে। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ডাকসু ও হল সংসদের জন্য নির্দিষ্ট ফি আদায় করা হয়। কিন্তু ১৯৯০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর দেওয়া ফি’র পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো দিতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিজ্ঞাপন
ডাকসুর এজিএস মুহিউদ্দিন খান জানান, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কিছু আর্থিক নথি পাওয়া গেলেও ১৯৯০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আয়ের ও ব্যয়ের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
কোষাধ্যক্ষ দপ্তর জানিয়েছে, ওই সময়ের নথি সংরক্ষণ করা হয়নি। তিনি আরও বলেন, ২০১৯ সালের ডাকসুর বাজেট কীভাবে ব্যয় হয়েছে, তার নিরপেক্ষ অডিট চাওয়া হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
ডাকসু নেতারা জানান, প্রশাসনের দেওয়া অপ্রতুল বাজেটের কারণে কাঠামোগত ইশতেহার বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে সান্ধ্যকালীন বাস সার্ভিস চালুর কথা উল্লেখ করা হয়, যা ইউজিসির অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডাকসুর কোষাধ্যক্ষ ড. এইচ এম মোশাররফ হোসাইন বলেন, পূর্ণাঙ্গ বাজেট এখনো অনুমোদন পায়নি। প্রাথমিকভাবে ডাকসু ও হল সংসদের কাজ শুরু করার জন্য সাময়িক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত নভেম্বরে একটি পূর্ণাঙ্গ বাজেট প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়া হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া এখনো শুরু হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাজেট প্রস্তুত করে জুন মাসের মধ্যে সিনেট অধিবেশনে তা পাস করার কথা। তবে বাস্তবতা হলো—ডাকসুর বর্তমান মেয়াদ শেষের দিকে থাকায়, পূর্ণাঙ্গ বাজেট পাওয়া নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর মধ্যেও ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের ইশতেহার অনুযায়ী কিছু কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, মেডিকেল সেন্টারের আধুনিকায়ন, স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম, আবাসন সংকট নিরসনের উদ্যোগ, উপাসনালয় সংস্কার, ক্যাম্পাস নিরাপত্তা জোরদার, লাইব্রেরি আধুনিকায়ন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক নানা কর্মসূচি।
তবে ডাকসু সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও পূর্ণাঙ্গ ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত ও স্বচ্ছ বাজেট বরাদ্দের কোনো বিকল্প নেই।







