কাঁঠালের বীজে গাকৃবির পেটেন্ট প্রযুক্তি

এতদিন অবহেলিত বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া কাঁঠালের বীজ এবার পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান তৈরির নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) গবেষকরা কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান বা ‘মিনারেল কনসেন্ট্রেট’ তৈরির একটি অভিনব প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। ইতোমধ্যে প্রযুক্তিটির জন্য বাংলাদেশ সরকারের পেটেন্টও অর্জন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এমদাদুল হক এবং তাঁর স্নাতকোত্তর গবেষক মো. আকরাম হোসেন যৌথভাবে তিন বছরের গবেষণার মাধ্যমে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। গাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় ২০২৫ সালের নভেম্বরে গবেষণাটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এ উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাকৃবির পেটেন্টপ্রাপ্ত প্রযুক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১টিতে। ‘গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে যাত্রা শুরুর পর এটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পেটেন্টপ্রাপ্ত প্রযুক্তি। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গবেষণার ফলাফলকে প্রযুক্তিতে রূপান্তর এবং বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ। তবে কাঁঠালের বীজ ও খোসাসহ বিভিন্ন অংশের একটি বড় অংশই বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, শুকনো কাঁঠালের বীজে প্রায় ২ শতাংশ খনিজ উপাদান রয়েছে। উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই খনিজ উপাদান ঘনীভূত করে ৩৩ শতাংশের বেশি মিনারেল কনসেন্ট্রেট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এতে খনিজ উপাদানের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যায়।
বিজ্ঞাপন
গবেষণাটি অর্থায়ন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (জিএআরই)’ প্রকল্প। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) প্রযুক্তিটির পেটেন্ট প্রদান করে। এর পেটেন্ট নম্বর পি/বিডি/২০২৪/০০০০৪০।
গবেষকদের মতে, মানবদেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি, হাড় ও দাঁতের গঠন, রক্ত উৎপাদন, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশির কার্যক্রম, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং বিভিন্ন এনজাইমের কার্যকারিতা বজায় রাখতে খনিজ উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কাঁঠালের বীজ থেকে উৎপাদিত মিনারেল কনসেন্ট্রেট বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহার করা হলে অধিক পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্যপণ্য তৈরি করা সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিজ বর্জ্যের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি খাদ্য অপচয় কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের বিকাশ, নতুন খাদ্যপণ্য উৎপাদন এবং কৃষিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারেরও সুযোগ তৈরি হবে।
বিজ্ঞাপন
গাকৃবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটি শুধু একটি পেটেন্ট অর্জন নয়; বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি গবেষণায় এটি একটি নতুন মাইলফলক। কৃষিজ বর্জ্যকে কীভাবে উচ্চমূল্যের পুষ্টিসমৃদ্ধ সম্পদে রূপান্তর করা যায়, আমাদের গবেষকরা তা প্রমাণ করেছেন। গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে শিল্প ও সমাজের উপযোগী প্রযুক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
প্রযুক্তিটির অন্যতম উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হলে নতুন পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্যপণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি কাঁঠালভিত্তিক শিল্পের সম্প্রসারণ, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং কৃষিজ সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
উল্লেখ্য, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৯৭টি উন্নত ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে।








