ভাত চুরির খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা

খুলনা নগরীতে মেসে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের ইসলাম নগর রোডের একটি চারতলা ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
নিহত আজমুল হোসেন (২১) চুয়াডাঙ্গার দর্শনা থানার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন।
খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, এ ঘটনায় আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হরিণটানা থানার ওসি মো. ইকবাল হোসেন জানান, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চারতলা ভবনটি পুরোপুরি ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল ভবনের চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষে ওঠেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মেসের কয়েকজন ছাত্রের কাছ থেকে স্থানীয়রা জানতে পারেন, শুক্রবার রাতে মেসের ম্যানেজার ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদীর ভাত আজমুল খেয়ে ফেলেন। এরপর ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেহেদী, মেসের কয়েকজন ছাত্র ও কয়েকজন বহিরাগত তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরে আশপাশের বাসিন্দারা ছাদ থেকে ভারী কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান। কিছুক্ষণ পর তারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। মেসের অন্য ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বিজ্ঞাপন
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক চিকিৎসক জানান, আজমুলের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তার দুই পা ভাঙা ছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর মেসের কয়েকজন ছাত্র জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান।
মেসের বুয়া ফাতেমা বলেন, এর আগেও আজমুলের বিরুদ্ধে টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ উঠেছিল। তবে শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে তাকে মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা মারধর করেন। তিনি তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা কথা শোনেননি বলে দাবি করেন তিনি।
পাশের ভবনের এক নারী বাসিন্দা জানান, রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনে বাইরে বের হন। তখন বাড়ির সামনের গলিতে এক তরুণকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে মেসের ছাত্ররা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, প্রায় এক বছর আগে পড়াশোনার জন্য ছেলে খুলনায় আসে। চলতি মাসের ১০ সেপ্টেম্বর সে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাড়ি থেকে খুলনায় যাওয়ার পর রাত ৯টার দিকে পরিবারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়।
কুতুব উদ্দিন বলেন, তখন আজমুল তাকে জানিয়েছিল, সে ভালো আছে এবং পরিবারকে চিন্তা না করতে। তবে রাত ১২টার পর আজমুলের ফোন থেকে অন্য একজন ফোন করে তার ছেলের বিরুদ্ধে ঝামেলার কথা জানায় এবং তাকে পেতে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলে।
তিনি বলেন, ওই ব্যক্তি টাকা নিয়ে দ্রুত খুলনায় আসতে বলেন। কিন্তু পরে সকালে এসে তিনি জানতে পারেন, তার ছেলে আর বেঁচে নেই।
বিজ্ঞাপন
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কুতুব উদ্দিন বলেন, “আমি কার কাছে এ বিচার দিব? আমি কারো কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।”
নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার পরিবারের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কথা বলেছে এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান তিনি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে। তাই সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সরাসরি কোনো এখতিয়ার নেই। তবে বিষয়টি জানার পর পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত চলছে। আজমুলকে কারা এবং কীভাবে মারধর করেছে, তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী এবং পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।








