Logo

জগন্নাথ হলে মাটির পোশাক-গহনায় ব্যতিক্রমী দুর্গাপ্রতিমা

profile picture
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:১৮
জগন্নাথ হলে মাটির পোশাক-গহনায় ব্যতিক্রমী দুর্গাপ্রতিমা
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করে এখন মণ্ডপের সাজসজ্জা, সৌন্দর্যবর্ধন ও আলোকসজ্জায় ব্যস্ত আয়োজকেরা। এবারের আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে মাটির তৈরি প্রতিমার পোশাক ও গহনা। প্রচলিত কাপড়ের পরিবর্তে মাটি দিয়ে এসব তৈরি করে প্রতিমায় ভিন্নধর্মী শৈল্পিক রূপ দিয়েছেন ভাস্কর স্বপন পাল।

বিজ্ঞাপন

আয়োজকদের ভাষ্য, জগন্নাথ হলের দুর্গাপূজায় এবারই প্রথম প্রতিমার পোশাক ও অলংকার তৈরিতে এ ধরনের ব্যতিক্রমী কাজ করা হচ্ছে। উৎসবকে আনন্দমুখর ও সুশৃঙ্খল করতে পূজা উদ্‌যাপন কমিটি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও নিয়েছে নানা উদ্যোগ।

এক মাসের পরিশ্রমে তৈরি হচ্ছে ব্যতিক্রমী প্রতিমা

প্রায় এক মাস আগে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন ভাস্কর স্বপন পাল। বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরি, মাটির প্রলেপে অবয়ব গঠন এবং রং করার মতো ধাপ পেরিয়ে এখন প্রতিমার চক্ষুদানের কাজ চলছে। এরপর পোশাক ও অলংকারের শেষ পর্যায়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে।

বিজ্ঞাপন

স্বপন পাল জানান, প্রতিমা তৈরিতে মাটি, খড়, বাঁশ ও রং ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এবারের বিশেষত্ব হলো মাটি দিয়ে পোশাক ও গহনা তৈরি করা। অন্য জায়গায় এ ধরনের কাজ হলেও জগন্নাথ হলে এবারই প্রথম এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরামিকস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা এই শিল্পী বংশপরম্পরায় প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর বাবা এ পেশায় কাজ করতেন। স্বপন পাল নিজে মূলত সিমেন্ট ও ফাইবার দিয়ে মূর্তি তৈরি করেন। তুলনামূলকভাবে মাটির প্রতিমা তৈরির কাজ করেন কম।

এবার প্রতিমা নির্মাণে তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন কাজ করছেন। স্বপন পালের হিসাবে, প্রতিমার প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজও শেষ করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

উৎসবের আনন্দের সঙ্গে নিরাপত্তায় গুরুত্ব

বিজ্ঞাপন

জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, প্রতিবছরের মতো এবারও নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদ্‌যাপন করা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থী শাওন সরকার রুদ্র জানান, হল প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এবং আশপাশের পুরোনো বসতিগুলোর মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিবছর এ আয়োজন সম্পন্ন হয়।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুরের মতো ঘটনা ঘটার প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী প্রাঙ্গণে যেন কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। নিরাপত্তার বিষয়টি পুলিশ প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখবে বলেও প্রত্যাশা তাঁর।

রুদ্রের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার আলোকসজ্জার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। মহালয়ার অনুষ্ঠানও আগের বছরের চেয়ে বড় পরিসরে আয়োজন করা হয়েছিল। গত ১০ অক্টোবরের ওই অনুষ্ঠানে রাত ১২টা পর্যন্ত মানুষের সমাগম ছিল। এবার দুর্গাপূজাকে ঘিরে উৎসবের আমেজ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ, আনসার ও বিএনসিসির সদস্যরা থাকবেন দায়িত্বে

পূজার দিনগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নিচ্ছে আয়োজক কমিটি। অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি পুলিশ ও আনসার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। অষ্টমী ও নবমীতে দর্শনার্থীদের চাপ বেশি হতে পারে বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি সদস্যদেরও দায়িত্বে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ ও পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. দেবাশীষ পাল জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা সম্পন্ন করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। এ আয়োজন সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, হিন্দুধর্মাবলম্বীরা পূজা-অর্চনা ও অঞ্জলিতে অংশ নেন। পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ মণ্ডপে আসেন, প্রসাদ গ্রহণ করেন এবং আয়োজকদের আপ্যায়নে অংশ নেন।

প্রস্তুতি সম্পর্কে অধ্যাপক দেবাশীষ পাল জানান, প্রতিমার সৌন্দর্যবর্ধন ও আলোকসজ্জার কাজ প্রায় শেষ। জগন্নাথ হলের বিভিন্ন অংশ, শামসুন্নাহার হলের দিকের এলাকা এবং পুকুরপাড় সাজানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব কাজ শেষ করতে আরও এক থেকে দুই দিন সময় লাগতে পারে।

নিরাপত্তা প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অগ্নিনির্বাপণ মহড়াও সম্পন্ন হয়েছে। এর আগে ঢাকা মহানগর পুলিশসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে আয়োজক কমিটি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও শাহবাগ থানার প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান হলের প্রাধ্যক্ষ।

বিজ্ঞাপন

দুর্গাপূজার বাজেট ২০ লাখ টাকার বেশি

অধ্যাপক ড. দেবাশীষ পালের তথ্য অনুযায়ী, জগন্নাথ হলের এবারের দুর্গাপূজার মোট ব্যয় ২০ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দিচ্ছে দুই লাখ টাকা। বাকি অর্থের বড় অংশ আসছে পূজা কমিটির উপদেষ্টামণ্ডলী, হলের সঙ্গে সম্পৃক্ত সনাতন ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি, শিক্ষক-কর্মচারী এবং মাঠে বসা বিভিন্ন দোকান থেকে সংগৃহীত অর্থের মাধ্যমে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের পর আগের দুই বছরের পূজার ব্যয় শেষে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে হলের শিবমন্দিরে নন্দীর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া জগন্নাথ হলের প্রতিষ্ঠাতা ও দানবীর কিশোরীলাল রায় চৌধুরীর স্মৃতি সংরক্ষণে তাঁর প্রতিকৃতি স্থাপন এবং অডিটোরিয়ামের নামকরণ করা হয়েছে ‘কিশোরীলাল রায় অডিটোরিয়াম’।

এবারের পূজার ব্যয় মেটানোর পর অর্থ অবশিষ্ট থাকলে তা ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আয়োজকেরা

প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি আমন্ত্রণপত্র বিতরণ, অতিথিদের আমন্ত্রণ, অর্থ সংগ্রহ এবং নিরাপত্তা সমন্বয়ের কাজও চালিয়ে যাচ্ছে পূজা উদ্‌যাপন কমিটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১৬ অক্টোবর বিকেল ৫টায় সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পূজার প্রস্তুতি ও পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে।

বিজ্ঞাপন

এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মণ্ডপের সাজসজ্জা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বাকি কাজ শেষ করার দিকে নজর আয়োজকদের। ব্যতিক্রমী মাটির পোশাক-গহনায় সাজানো প্রতিমা এবং সর্বজনীন অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে এবারের দুর্গাপূজা আনন্দমুখর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করার প্রত্যাশা তাঁদের।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD