সিগন্যালে দাঁড়িয়েই ইফতার, নগরী সচল রাখছেন ট্রাফিক পুলিশ

রমজানের বিকেল নামলেই রাজধানী ঢাকার চেনা চিত্র বদলে যায়। অফিস ছুটির ভিড়, স্কুলফেরত শিক্ষার্থী, বাজারের ব্যাগ হাতে ছুটে চলা মানুষ—সব মিলিয়ে সড়কে তৈরি হয় বাড়তি চাপ। সবার লক্ষ্য একটাই—আযানের আগে ঘরে ফেরা। আর এই তাড়াহুড়ার মধ্যেই সিগন্যালের মোড়ে দাঁড়িয়ে দায়িত্ব পালন করেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। অনেকের ইফতারও সেরে নিতে হয় ঠিক সড়কের পাশেই।
বিজ্ঞাপন
বিজয় সরণি, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, কারওয়ান বাজারসহ রাজধানীর ব্যস্ত মোড়গুলোতে রমজান মাসে দৃশ্যটা প্রায় একই রকম। সূর্য ডোবার আগে গাড়ির গতি কিছুটা কমলেও ব্যস্ততা কমে না। ছোট্ট ট্রাফিক বক্স কিংবা সিগন্যালের পাশে সামান্য জায়গাই তখন ইফতারের প্রস্তুতির স্থান। কোথাও ছোলা-মুড়ি, খেজুর ও পানির ছোট প্যাকেট, আবার কোথাও ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে কেনা সামান্য খাবার—সবই দ্রুত সেরে নেওয়ার আয়োজন।
ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বসূচিতে সকাল ও বিকেলের দুটি পালা থাকে। তবে বিকেলের পালাটিই সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। ইফতারের ঠিক আগমুহূর্তে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। এ সময় এক হাতে বাঁশি, অন্য হাতে ইফতারের প্যাকেট—এমন দৃশ্য রাজধানীর সড়কে অচেনা নয়। দায়িত্বে অবহেলার সুযোগ নেই, তাই আযানের সময়ও চোখ থাকে সিগন্যালের দিকে।
বিজ্ঞাপন
অনেকেই দল বেঁধে ট্রাফিক বক্সে বসে ইফতার করেন। আবার অনেকে দাঁড়িয়ে কিংবা রাস্তার ধারে ছোট্ট বিরতি নিয়েই খাবার মুখে তোলেন। ছুটির দিনে চাপ কিছুটা কম থাকলে একসঙ্গে বসার সুযোগ মিললেও কর্মদিবসে সেটি বিরল। তবু দায়িত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের তথ্যমতে, রমজানে বিকেলের পালায় রাজধানীতে প্রায় ২ হাজার ৩০০ ট্রাফিক সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সঙ্গে থাকেন আরও প্রায় ৫০০ ট্রাফিক সহায়তাকারী। ইফতারের আগে নির্ধারিত বরাদ্দ থেকে সদস্যদের কাছে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হয়, যাতে দায়িত্বের ফাঁকেই অন্তত ন্যূনতম ইফতার করা যায়।
বিজয় সরণি সংলগ্ন এলাকায় দায়িত্ব পালনরত এক ট্রাফিক সদস্য জানান, দাপ্তরিক প্যাকেটের পাশাপাশি অনেক সময় নিজেদের পছন্দের কিছু খাবারও কিনে নেন তারা। সড়কের পাশেই সহকর্মীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ইফতার করেন। পরিবার ছাড়া ইফতার করতে কষ্ট হয় কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমদিকে খারাপ লাগলেও এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। দায়িত্বই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
রোদ, ধুলো আর গাড়ির হর্নের শব্দের মধ্যে ইফতার করা সহজ নয়। তবু বছরের পর বছর এভাবেই রোজা কাটে অনেক ট্রাফিক সদস্যের। নতুনদের জন্য শুরুটা কঠিন হলেও ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে হয়। দ্রুত খাবার শেষ করে আবার সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাওয়া—রমজানের সন্ধ্যার এটাই তাদের চেনা চক্র।
আরও পড়ুন: মশুরীখোলা দরবারে ১৫৬তম ওরশ মোবারক
শহরের মানুষ যখন পরিবারের সঙ্গে ইফতারের টেবিলে বসার প্রস্তুতি নেন, ঠিক তখনই কোথাও না কোথাও সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে একজন ট্রাফিক সদস্য খেজুর মুখে দিয়ে আবার হাত তুলছেন গাড়ি থামানোর সংকেত দিতে। অনেক সময় ইফতারের প্রথম লোকমাটিও মুখে ওঠে দেরিতে।
বিজ্ঞাপন
পুরো রাজধানীজুড়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার সদস্য সড়কে দায়িত্ব পালন করেন, যাতে রমজানের সন্ধ্যায় যানজট ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে থাকে। তাদের এই সমন্বিত প্রচেষ্টার ফলেই বহু মানুষ সময়মতো ঘরে ফিরতে পারেন।
রমজান তাই তাদের কাছে শুধু সংযমের মাস নয়, দায়িত্ব পালনেরও মাস। ব্যক্তিগত অনুভূতি অনেক সময় আড়ালে রেখে নগরীর ছন্দ সচল রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য। প্রতিটি সন্ধ্যায়, প্রতিটি সিগন্যালে—এক হাতে ইফতার, অন্য হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ—নগরজীবনের এই নীরব গল্প প্রতিদিনই লেখা হচ্ছে রাজধানীর ব্যস্ত সড়কে।








