আগুন নিয়ন্ত্রণে, তবু সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় চকবাজারের ব্যবসায়ীরা

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের ছোট কাটারা গলিতে মনসুর খান প্লাজায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ মালামাল পুড়ে গেছে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না পারায় নিজেদের গোডাউনে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা জানতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। কেউ প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ হারানোর আশঙ্কা করছেন, আবার কেউ কোটি কোটি টাকার পণ্য নষ্ট হওয়ার দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। আগুনে পুঁজি হারানোর শঙ্কার পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণে আশপাশের দোকান বন্ধ থাকায় আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালেও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের সামনে জড়ো হয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায় ব্যবসায়ীদের। কখন ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে নিজেদের মালামালের অবস্থা দেখতে পারবেন, সেই অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। অনেকের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের ব্যবসার পুঁজি আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে।
গোডাউন মালিক মো. রবিন জানান, সাততলা মনসুর খান প্লাজার পাঁচ, ছয় ও সাততলায় ব্যাগ ও প্রসাধনসামগ্রীর গোডাউন রয়েছে। তাঁর গোডাউন ভবনের ছয়তলার ডান পাশে। আগুনও ওই তলাতেই লেগেছে। কিন্তু ভবনের ভেতরে ঢোকার সুযোগ না থাকায় মালামালের অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারছেন না তিনি।
রবিন বলেন, ‘গোডাউনে প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাগ ছিল। এখন যদি সব পুড়ে যায়, আমি সর্বস্বান্ত হয়ে যাব।’
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও জানান, ভবনের ওই তিন তলায় ৫০টির বেশি গোডাউন রয়েছে। প্রতিটি গোডাউনে আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকার মালামাল মজুত ছিল। নিচের তলাগুলোতে রয়েছে ব্যাগ ও প্রসাধনসামগ্রীর দোকান।

আগুন লাগার খবর পাওয়ার বিষয়ে রবিন বলেন, আগুন মূলত ছয় ও সাততলায় ছড়িয়ে পড়ে। পাঁচ ও ছয়তলায় গোডাউন থাকায় সেখানে সাধারণত কেউ থাকেন না। মালামাল আনা-নেওয়ার প্রয়োজন হলেই ব্যবসায়ীরা সেখানে যান। গতকাল বিকেল ৫টার দিকে নিচতলার একটি দোকানের কর্মচারীর কাছ থেকে আগুন লাগার খবর পান তিনি। এরপর থেকে আর ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
আগুন নিয়ন্ত্রণে দেরি নিয়ে ব্যবসায়ীর ক্ষোভ
বিজ্ঞাপন
ভবনের নিচতলায় ব্যাগের দোকান রয়েছে মো. ইমতিয়াজের। আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি।
ইমতিয়াজ বলেন, ‘গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে, আর আজ সকাল ১০টা পর্যন্ত ধোঁয়া বের হচ্ছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে আসতে এত সময় লাগল কেন, সেটাই আমাদের প্রশ্ন। ফায়ার সার্ভিস মূলত দায়সারা কাজ করছে। তারা আগুন নেভাতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে না।’
নিজেদের আর্থিক অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন অবস্থা হয়েছে, সকালে মালিক, বিকেলে ফকির। ফায়ার সার্ভিসের গাফিলতির কারণে আগুন এখন পর্যন্ত জ্বলছে। আমরা সরকারের কাছে আবেদন জানাই, এমন সরঞ্জাম আনা হোক, যাতে উন্নত বিশ্বের মতো দ্রুত আগুন নেভানো যায়। এই ভবনে কোটি কোটি টাকার মালামাল রয়েছে। আগুন যথাসময়ে নিয়ন্ত্রণে না আসায় অনেক ব্যবসায়ী পথে বসে গেছেন।’
বিজ্ঞাপন
ক্ষয়ক্ষতির হিসাব জানা যাচ্ছে না
ভবনের অন্যান্য গোডাউনের মালিকেরাও এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারেননি। আগুনে মজুত পণ্য কতটা রক্ষা পেয়েছে, তা জানতে ভবনের ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। ছয় ও সাততলায় দীর্ঘ সময় ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় বিপুল পরিমাণ মালামাল পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
অগ্নিকাণ্ডের পর নিরাপত্তার কারণে ছোট কাটারা গলির আশপাশের আরও ১০ থেকে ১৫টি ভবন বন্ধ করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ভবনে প্রসাধনসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের অসংখ্য দোকান রয়েছে। ভবনগুলো বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিক কার্যক্রম চালাতে পারছেন না। ফলে অগ্নিকাণ্ডে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের পাশাপাশি আশপাশের ব্যবসায়ীরাও আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
আগুন লাগা ভবনের পাশের একটি ভবনে প্রসাধনসামগ্রীর দোকান রয়েছে মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের। তিনি জানান, সোমবার বিকেল থেকে তাঁর দোকান বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবসা বন্ধ থাকায় ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
সাইদুর রহমান বলেন, ‘গতকাল বিকেল থেকে আমাদের দোকান বন্ধ। এত দীর্ঘ সময় দোকান বন্ধ থাকায় আমরা মারাত্মক ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। আমরা চাই, দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হোক, যাতে আবার ব্যবসা করতে পারি।’
ভবনের দারোয়ান মো. মজিবুল্লাহও আগুন নেভানোর প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘গতকাল বিকেল ৫টায় আগুন লেগেছে। শুধু পানি দিয়ে বিল্ডিং ভরে ফেলছে। ভেতরে আগুন জ্বলছে, ধোঁয়া বের হচ্ছে।’
ভোরে নিয়ন্ত্রণে আসে আগুন
বিজ্ঞাপন
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১২ অক্টোবর) বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে মনসুর খান প্লাজায় আগুন লাগার খবর পায় সংস্থাটি। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট কাজ করে। মঙ্গলবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
ফায়ার সার্ভিস সদরদপ্তরের মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, মনসুর খান প্লাজার আগুন নেভাতে ১০টি ইউনিট কাজ করেছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে মার্কেটটির ছয়তলায় থাকা সব মালামাল পুড়ে গেছে।
আগুন নেভানোর সময় তীব্র ধোঁয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের দুই কর্মী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সরু রাস্তা ও ভবনের কাঠামোগত জটিলতার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে বেগ পেতে হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
বিজ্ঞাপন
আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও মনসুর খান প্লাজার ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ কাটেনি। গোডাউনের দরজা খুলে ভেতরের অবস্থা দেখার আগপর্যন্ত তাঁরা ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব জানতে পারছেন না। দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ব্যবসার পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন অনেকে। একই সঙ্গে আশপাশের দোকান বন্ধ থাকায় ব্যবসায়িক ক্ষতির বোঝাও বাড়ছে তাঁদের।








