Logo

এখন শুধু রায়ের ‘অপেক্ষা’, মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৬ জুন, ২০২৬, ১৫:০৪
এখন শুধু রায়ের ‘অপেক্ষা’, মৃত্যুদণ্ড চায় রাষ্ট্রপক্ষ
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দায়ের করা বহুল আলোচিত মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পর আগামীকাল রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করেছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। ফলে দেশজুড়ে আলোচিত এ মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন নিহত শিশুর পরিবার, সংশ্লিষ্ট পক্ষ এবং সাধারণ মানুষ।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আদালতে দীর্ঘ শুনানির পর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ তাদের চূড়ান্ত যুক্তি উপস্থাপন করে। শুনানি শেষে বিচারক আগামী দিনের জন্য রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন।

মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সাক্ষীদের জবানবন্দি, ফরেনসিক আলামত, ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আসামির স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে অভিযোগগুলো সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতে বলেন, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত তথ্য-প্রমাণের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ঘটনার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। তার মতে, প্রধান আসামি সোহেল রানা পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করেন এবং পরে অপরাধের আলামত গোপনের চেষ্টা চালান। এ কাজে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার সহযোগিতা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ভিকটিমকে হত্যা করার পর মরদেহ গোপন ও খণ্ড-বিখণ্ড করার ঘটনাও সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে। এসব বিবেচনায় উভয় আসামির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানানো হয়।

শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী বলেন, মামলার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আসামি তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে কখনো ‘ডলার’ নামের কোনো ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় হঠাৎ ওই নাম সামনে আনা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, এ ধরনের বক্তব্য মামলার মূল বিচারিক বিষয়কে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা হতে পারে। তদন্তে বা মামলার কোনো নথিতে ওই নামের ব্যক্তির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়নি বলেও তিনি দাবি করেন।

রাষ্ট্রপক্ষ আদালতে যুক্তি দেয়, ঘটনাটি ঘটেছে এমন একটি ফ্ল্যাটে যেখানে ঘটনার সময় অন্য কোনো ব্যক্তির উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ভিকটিমকে শেষবার ওই পরিবেশেই দেখা গিয়েছিল।

আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা উল্লেখ করে প্রসিকিউশন জানায়, ফ্ল্যাটের ভেতরে কী ঘটেছিল সে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি তথ্য আসামিদের কাছেই থাকার কথা। কিন্তু শিশুটির মৃত্যু, মরদেহের অবস্থা কিংবা ঘটনার ব্যাখ্যা সম্পর্কে তারা আদালতে গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং সাক্ষীদের বর্ণনা একে অপরকে সমর্থন করেছে, যা মামলাটিকে শক্তিশালী করেছে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োগ পাওয়া আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ আদালতের কাছে প্রধান আসামির জন্য মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন জানান।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, তদন্তে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভর করা হয়েছে। এছাড়া মামলার কিছু আলামত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় প্রধান আসামি মাদকাসক্ত অবস্থায় ছিলেন বলেও বিবেচনার বিষয় রয়েছে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতকে জানান, প্রধান আসামি নিজেই আদালতের কাছে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া যেতে পারে।

অন্যদিকে সহ-আসামি স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে যেহেতু মূল অভিযোগ লাশ গোপনে সহযোগিতা করা, তাই সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত শাস্তি প্রয়োগের আবেদন জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

আসামিপক্ষের আইনজীবী জানান, বিচার চলাকালে আসামিরা নিজেদের পক্ষে কোনো সাক্ষী হাজির করেননি। আদালতে তারা কোনো সাফাই সাক্ষ্য কিংবা বিকল্প প্রমাণও উপস্থাপন করেননি।

তিনি বলেন, আলোচিত এই মামলায় অনেক আইনজীবী আসামিপক্ষে দাঁড়াতে আগ্রহ দেখাননি। পরবর্তীতে আইনি বিধান অনুসারে রাষ্ট্র তাকে আসামিদের পক্ষে দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ দেয়।

শুনানির আগের দিন আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও একই সঙ্গে ক্ষমা প্রার্থনার কথাও বলেন। তার বক্তব্যে ‘ডলার’ নামের একজনের প্রসঙ্গও উঠে আসে।

বিজ্ঞাপন

অপর আসামি স্বপ্না আক্তার আদালতের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।

মামলায় মোট ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নিহত শিশুর বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা আদালতে সাক্ষ্য দেন। শিশু সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রামিসার বড় বোনের সাক্ষ্য বিশেষ পদ্ধতিতে গ্রহণ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিচার চলাকালে তদন্তে উদ্ধার করা বিভিন্ন আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা সামগ্রী, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপকরণও ছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এসব তথ্য-প্রমাণ একত্রে বিচার করলে অপরাধ সংঘটনের পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গত ১৯ মে রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার একটি বাসা থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা আক্তারের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান আসামি সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সময়ে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকেও আটক করা হয়।

তদন্ত শেষে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। ডিএনএ পরীক্ষা, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য ফরেনসিক তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত সম্পন্ন করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।

বহুল আলোচিত এই মামলায় যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য দিন নির্ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে রায়ের তারিখ ঘোষণার পর দুই আসামিকে আবার কারাগারে পাঠানো হয়। এখন রামিসার স্বজনদের পাশাপাশি সারা দেশের মানুষের দৃষ্টি আদালতের রায়ের দিকে। শিশু নির্যাতন ও হত্যার এই ঘটনায় আদালত কী সিদ্ধান্ত দেন, সেটিই আগামী দিনের অন্যতম আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD