Logo

চেক ডিজঅনার মামলায় অর্থ আদায়ই মূল লক্ষ্য, কারাদণ্ড নয়

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জুলাই, ২০২৬, ১২:৪৫
চেক ডিজঅনার মামলায় অর্থ আদায়ই মূল লক্ষ্য, কারাদণ্ড নয়
ছবি: সংগৃহীত

চেক ডিজঅনার বা বাউন্সের ঘটনায় দায়ের করা মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো পাওনাদারের অর্থ আদায় নিশ্চিত করা, আসামিকে কারাগারে পাঠানো নয়—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের আওতায় করা মামলায় কারাদণ্ড ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতিতেই দেওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি প্রকাশিত এক রায়ে বিচারপতি ড. মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন। গত ২২ জুলাই রায়টি দেওয়া হলেও এর লিখিত অনুলিপি বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশ করা হয়েছে।

রায়ে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থদণ্ড বহাল রাখলেও ছয় মাসের কারাদণ্ড বাতিল করে দেন। একই সঙ্গে বকেয়া অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলার উদ্দেশ্য শাস্তি প্রদান নয়; বরং চেকের মাধ্যমে প্রতিশ্রুত অর্থ আদায় নিশ্চিত করা। তাই কারাদণ্ডকে সাধারণ শাস্তি হিসেবে বিবেচনা না করে কেবল বিশেষ ও যৌক্তিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা উচিত।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আদালত এ বিষয়ে পূর্বের ‘আমান উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ের দৃষ্টান্তও উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, চেক ডিজঅনার মামলায় কারাদণ্ড একটি কঠোর শাস্তি এবং এর মাধ্যমে শাস্তিমূলক উদ্দেশ্য তেমনভাবে পূরণ হয় না। বর্তমান মামলায়ও হাইকোর্ট সেই নীতির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, বরিশালের এক গবাদিপশু ব্যবসায়ী ব্যবসায়িক প্রয়োজনে মো. আলাউদ্দিনকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেন। পরে ঋণ পরিশোধের জন্য আলাউদ্দিন রূপালী ব্যাংকের বরিশাল বাজার রোড শাখার একটি চেক প্রদান করেন।

২০২০ সালের ২ নভেম্বর চেকটি ব্যাংকে জমা দেওয়া হলে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেটি ডিজঅনার বা বাতিল হয়। পরে আইন অনুযায়ী নোটিশ পাঠানো হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করায় একই বছরের ২০ ডিসেম্বর এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলাটি পরে বরিশালের তৃতীয় যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন হয় এবং ২০২১ সালের অক্টোবরে আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

বিচার শেষে ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি আদালত মো. আলাউদ্দিনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের সমপরিমাণ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে অর্থদণ্ডের অর্ধেক, অর্থাৎ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জমা দিয়ে তিনি আপিল করেন। তবে আপিল আদালতও নিম্ন আদালতের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বহাল রেখে তার আবেদন খারিজ করে দেন।

বিজ্ঞাপন

এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন আলাউদ্দিন।

রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের দোষী সাব্যস্ত করার সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে কারাদণ্ডের অংশটি বাতিল করে কেবল অর্থদণ্ড বহাল রাখা হয়।

একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দেন, রায়ের অনুলিপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে আসামিকে বাকি দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। রায়ে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করলে আসামিকে দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, কারাদণ্ড ভোগ করলেও অর্থদণ্ড পরিশোধের দায় থেকে তিনি মুক্ত হবেন না। প্রয়োজনে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারা অনুযায়ী আদালত আইনগত প্রক্রিয়ায় ওই অর্থ আদায় করবে।

মামলায় আসামিপক্ষে আইনজীবী হিসেবে ছিলেন মো. সাইফুল আলম। বাদীপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন আইনজীবী দেব দুলাল বড়াল। রাষ্ট্রের পক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সফিকুল ইসলাম এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফারহানা আবেদীন, হেমায়েত উদ্দিন ও কে এম সাইফুল ইসলাম আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

আইন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে চেক ডিজঅনার মামলায় শাস্তির পরিবর্তে পাওনাদারের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করার বিষয়টিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার নীতিকে আরও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে হাইকোর্ট।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD