Logo

দুই স্থানীয় সাক্ষী ছাড়া তল্লাশি-জব্দ বেআইনি: হাইকোর্ট

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৫২
দুই স্থানীয় সাক্ষী ছাড়া তল্লাশি-জব্দ বেআইনি: হাইকোর্ট
ছবি: সংগৃহীত

ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান অনুসারে অন্তত দুজন স্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তির উপস্থিতি ছাড়া তল্লাশি ও জব্দ কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে তা বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের তল্লাশি থেকে পাওয়া তথ্য ফৌজদারি বিচারে বিবেচনায় নেওয়া যাবে না বলে রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

বিজ্ঞাপন

‘রত্না খাতুন বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় এ পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি মাদক উদ্ধারের অভিযোগে দণ্ডিত রত্না খাতুনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার দণ্ডাদেশ বহাল রেখে আপিল খারিজের রায় বাতিল করা হয়েছে।

গত ১৭ জুলাই বিচারপতি মো. সেলিমের একক বেঞ্চ এ রায় দেন। অধস্তন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে করা ফৌজদারি রিভিশন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে আদালত এ সিদ্ধান্ত নেন। ১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি গত ১১ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

তল্লাশি ও জব্দে সাক্ষীর উপস্থিতি বাধ্যতামূলক

বিজ্ঞাপন

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার ১ ও ২ উপধারা অনুযায়ী কোনো স্থানে তল্লাশি চালানো এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বস্তু জব্দ করার সময় অন্তত দুজন স্থানীয় সম্মানিত ব্যক্তির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। তল্লাশি শুরু থেকে শেষ হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আদালত বলেন, স্থানীয় সাক্ষীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগে তল্লাশি ও জব্দের কাজ শেষ করা হলে অথবা তারা চলে যাওয়ার পর এসব কার্যক্রম পরিচালিত হলে আইনের বিধান অনুসরণ করা হয় না। এ নিয়ম কঠোরভাবে না মেনে পরিচালিত তল্লাশি ও জব্দ বেআইনি এবং ফৌজদারি বিচারে তা বিবেচনার অযোগ্য।

২০০৮ সালে বাড়িতে অভিযান, পরে কারাদণ্ড

বিজ্ঞাপন

মামলার রায় অনুযায়ী, ২০০৮ সালের ২৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা থানার কাছারিপাড়া গ্রামে রত্না খাতুনের বাড়িতে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি দল। অধিদপ্তরের পরিদর্শক মো. ফারুক সুলতানের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে তাকে আটক করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, পরে একজন নারী কনস্টেবলের মাধ্যমে তল্লাশি চালিয়ে রত্না খাতুনের কাছ থেকে কাগজে মোড়ানো ২৫ পুরিয়া হেরোইন উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা মাদকের ওজন ছিল আনুমানিক তিন গ্রাম।

এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০-এর ১৯(১) ধারার সারণি ১(ক) অনুযায়ী মামলা হয়। তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলে মামলাটি কুষ্টিয়ার দায়রা আদালতে বিচারের জন্য পাঠানো হয়।

বিজ্ঞাপন

২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি কুষ্টিয়ার তৃতীয় আদালতের যুগ্ম দায়রা জজ রত্না খাতুনকে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেন। অর্থদণ্ড অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।

পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন রত্না খাতুন। ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের সাজা বহাল রাখেন। এরপর ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন তিনি।

সাক্ষীদের বক্তব্যে অসংগতি, তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন

বিজ্ঞাপন

হাইকোর্টে রত্না খাতুনের পক্ষে আইনজীবী মো. ইলিয়াস আহমেদ যুক্তি দেন, তার মক্কেলের কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের অভিযোগ নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তা নিজেই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে জব্দতালিকার সাক্ষীরাও আদালতে মাদক উদ্ধারের ঘটনা সমর্থন করেননি।

রাষ্ট্রপক্ষে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ আখতারুল ইসলাম যুক্তি দেন, বিচারিক আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেই আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন এবং আপিল আদালতও যথাযথভাবে সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছিলেন।

তবে মামলার নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনায় হাইকোর্ট দেখতে পান, অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পরিদর্শক ফারুক সুলতানই তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার জবানবন্দি ছাড়া প্রসিকিউশনের অন্য কোনো সাক্ষী মাদক উদ্ধারের ঘটনা সমর্থন করেননি। অধিদপ্তরের সদস্য হিসেবে সাক্ষ্য দেওয়া একজন কনস্টেবলও এ বিষয়ে কিছু বলেননি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

জব্দতালিকার দুই সাক্ষীর বক্তব্যেও অসংগতি পাওয়া যায়। একজন জানান, ঘটনাস্থলে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দেখতে পান এবং জব্দতালিকায় স্বাক্ষর করেন। তবে মাদক উদ্ধারের বিষয়ে তার প্রত্যক্ষ কোনো জ্ঞান ছিল না। অপর সাক্ষী জানান, তিনি ভেড়ামারা মোটর শ্রমিক কার্যালয়ে বসে থাকার সময় অধিদপ্তরের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তার স্বাক্ষর নেন।

দণ্ডাদেশ বাতিল করে খালাসের নির্দেশ

সাক্ষ্য-প্রমাণের এসব অসংগতি এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারার বিধান বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট রিভিশন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করেন।

বিজ্ঞাপন

এর ফলে ২০১৪ সালের ১৩ এপ্রিল দেওয়া আপিল খারিজের রায় বাতিল হয়ে যায়। ওই রায়ের মাধ্যমে বহাল থাকা নিম্ন আদালতের দণ্ডাদেশও আর কার্যকর থাকেনি। হাইকোর্ট রত্না খাতুনকে অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ার নির্দেশ দেন এবং রায়ের অনুলিপিসহ অধস্তন আদালতের নথিপত্র অবিলম্বে ফেরত পাঠাতে বলেন।

আদালতের এ রায়ে ফৌজদারি মামলায় তল্লাশি ও জব্দ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ এবং সাক্ষীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও উঠে এসেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD