ঈদকে ঘিরে রেমিট্যান্সে জোয়ার, শক্তিশালী হচ্ছে দেশের রিজার্ভ

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থের প্রবাহ বাড়ায় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিবার-পরিজনের অতিরিক্ত খরচ মেটাতে প্রবাসীরা বেশি করে টাকা পাঠানোয় চলতি মাসের প্রথমার্ধেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে দেশে।
বিজ্ঞাপন
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে জানা যায়, ১৬ মার্চ পর্যন্ত দেশের মোট (গ্রোস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে এ রিজার্ভের পরিমাণ ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার।
এক বছর আগের একই সময়ে দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা বিপিএম-৬ হিসাবে ছিল ২০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক বছরে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ বেড়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মোট রিজার্ভের পুরোটা ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি দায়-দেনা ও অন্যান্য বাধ্যবাধকতা বাদ দিলে যে প্রকৃত বা নিট রিজার্ভ থাকে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ হিসাবে বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বলে জানা গেছে। এই পরিমাণ দিয়ে প্রায় পাঁচ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিরাপদ সীমার মধ্যেই রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে বৈদেশিক ঋণ ও ব্যাংকিং খাত থেকে ডলার সংগ্রহ করতে হয়েছিল।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। ডলার বিক্রি কমানো, হুন্ডি ও অর্থপাচার রোধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগের ফলে রিজার্ভে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। বর্তমানে রিজার্ভ ৩৩ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে প্রবাসী আয় বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে। ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কিনছে, যার ফলে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ডলারের বিনিময় হার অতিরিক্ত কমে গেলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে নানা অনিয়ম, অর্থপাচার এবং বৈদেশিক লেনদেনের চাপে তা কমতে থাকে। ২০২৪ সালের আগস্টে তা নেমে আসে প্রায় ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে চলতি মার্চের প্রথম ১৪ দিনেই দেশে এসেছে ২২০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে ৩০২ কোটি, জানুয়ারিতে ৩১৭ কোটি এবং ডিসেম্বর মাসে ৩২২ কোটি ডলার রেমিট্যান্স আসে।
প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত ব্যাংকগুলো থেকে প্রায় সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আমদানির চাপ তুলনামূলক কম থাকায় রিজার্ভ বাড়তে সহায়তা করছে। তবে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়লে আমদানিও বাড়বে, ফলে ডলারের চাহিদা বৃদ্ধি পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে এবং বড় ধরনের ডলার সংকটের আশঙ্কা কমে আসবে।








