প্রযুক্তি আপডেটেও কমছে না বিনিয়োগকারীর অর্থ-শেয়ার আত্মসাৎ

পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগের পরও অনিয়ম, তথ্য বিকৃতি এবং গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, অধিকাংশ ব্রোকারেজ হাউসে নতুন সফটওয়্যার সংযোজন করা হলেও এর গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধাপ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। গ্রাহকের তথ্য স্থানান্তর, নগদ অর্থ ও শেয়ার ব্যবস্থাপনা, কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন তৈরিতে এখনও নানা সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের সম্পদ সুরক্ষার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে সংঘটিত বড় বড় অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের ঘটনায় দুর্বল ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার এবং সফটওয়্যারের বাইরে বিকল্প বা ডুপ্লিকেট সিস্টেম ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এসব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব ব্রোকারেজ হাউসে অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার চালুর নির্দেশনা দেয়। লক্ষ্য ছিল কোনো তথ্য পরিবর্তন, মুছে ফেলা বা বিকৃত করার সুযোগ বন্ধ করা এবং প্রতিটি লেনদেনের নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি আলোচিত সালতা ক্যাপিটাল কেলেঙ্কারি প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার দুর্বলতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার বেশি অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। তদন্তে জানা যায়, গ্রাহকদের সিডিবিএল হিসাবের সঙ্গে থাকা মোবাইল নম্বর পরিবর্তন করে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন নম্বর যুক্ত করা হয়েছিল। এরপর বিভিন্ন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ স্থানান্তর করা হয়। এই ঘটনাকে বাজারসংশ্লিষ্টরা প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
বিজ্ঞাপন
উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যাক-অফিস ব্যবস্থা কিংবা ডুপ্লিকেট সফটওয়্যারের সুযোগ নিয়ে অন্তত সাতটি ব্রোকারেজ হাউসে প্রায় ৪৫ হাজার বিনিয়োগকারীর ৬৫০ কোটিরও বেশি টাকা ও শেয়ার আত্মসাতের অভিযোগ উঠে এসেছে। এসব ঘটনার কারণে পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ডিএসইর প্রতিবেদনে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ডেটা মাইগ্রেশন বা তথ্য স্থানান্তরের অসম্পূর্ণতা। ২৮০টি ব্রোকারেজ হাউসে নতুন সফটওয়্যার স্থাপন করা হলেও ১১৮টি প্রতিষ্ঠানে গ্রাহকদের তথ্য সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তর করা হয়নি। এছাড়া ১০২টি প্রতিষ্ঠানে লেজার, পোর্টফোলিও এবং আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত তথ্যও অসম্পূর্ণ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তথ্য স্থানান্তর পুরোপুরি সম্পন্ন না হলে গ্রাহকের প্রকৃত নগদ অর্থ, শেয়ার এবং বিনিয়োগ অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে অনিয়ম শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। পুরোনো ও নতুন তথ্যভান্ডার পাশাপাশি ব্যবহারের কারণে তথ্যের অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
বিজ্ঞাপন
ডিএসইর তথ্য বলছে, এখনও ২৪টি ব্রোকারেজ হাউস পুরোনো সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে ১৩টি প্রতিষ্ঠান নিয়মিতভাবে গ্রাহকদের দৈনিক পোর্টফোলিও বিবরণী পাঠাচ্ছে না। এতে বিনিয়োগকারীরা তাদের হিসাবে কোনো অননুমোদিত পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা সময়মতো জানতে পারছেন না।
স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা বা নোটিফিকেশন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ১৩৫টি এবং অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ১২২টি ব্রোকারেজ হাউস এখনো এসএমএস বা ই-মেইলের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠায় না। অথচ আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী মোবাইল নম্বর, ই-মেইল, ব্যাংক হিসাব বা অর্থ উত্তোলনসংক্রান্ত কোনো পরিবর্তন ঘটলেই গ্রাহককে তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ আর্থিক প্রতারণার শুরুতেই গ্রাহকের যোগাযোগের তথ্য পরিবর্তন করা হয়। তাই তাৎক্ষণিক নোটিফিকেশন ব্যবস্থা কার্যকর না থাকলে প্রতারণা দ্রুত শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে কনসোলিডেটেড কাস্টমার্স অ্যাকাউন্ট (সিসিএ) সমন্বয় প্রতিবেদন। ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, ১৩৩টি স্টেকহোল্ডার এখনো এই প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়নি। ফলে ব্রোকারেজ হাউসের হিসাবে প্রদর্শিত অর্থ এবং ব্যাংকে সংরক্ষিত প্রকৃত অর্থের মধ্যে মিল যাচাই করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ডিএসইর মূল্যায়নে আরও দেখা গেছে, বিভিন্ন সফটওয়্যার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অধীন ব্রোকারেজ হাউসগুলোর মধ্যে বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে পার্থক্য রয়েছে। কয়েকটি সফটওয়্যারে তথ্য স্থানান্তর, নোটিফিকেশন ব্যবস্থা এবং প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তুলনামূলক বেশি সীমাবদ্ধতা শনাক্ত হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর কেউ কেউ দাবি করেছে, তাদের সফটওয়্যারে বড় ধরনের কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা নেই এবং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
বিএসইসি জানিয়েছে, সফটওয়্যার বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে প্রযুক্তিগত বা পরিচালনাগত দুর্বলতা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে কোনো ব্রোকারেজ হাউস সফটওয়্যার বাস্তবায়নে গাফিলতি করলে কিংবা বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ডিএসইর কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার বাস্তবায়নের কাজ এখনো চলমান রয়েছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সময়সাপেক্ষ হলেও এটি দ্রুত সম্পন্ন করতে স্টক এক্সচেঞ্জ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু কঠোর আইন বা শাস্তি যথেষ্ট নয়; প্রযুক্তিগত নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। সফটওয়্যারের দুর্বলতার কারণে যদি গ্রাহকের অর্থ ও শেয়ার আত্মসাতের সুযোগ থেকেই যায়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে ডিজিটাল রূপান্তরের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। এই সময়ে ব্যাক-অফিস সফটওয়্যার বাস্তবায়নের ঘাটতি ভবিষ্যতের সংস্কার কার্যক্রমকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তাই দ্রুত ডেটা মাইগ্রেশন সম্পন্ন করা, স্বয়ংক্রিয় নোটিফিকেশন চালু করা, সিসিএ রিপোর্টিং নিশ্চিত করা এবং সব ব্রোকারেজ হাউসে অভিন্ন প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা মানদণ্ড কার্যকর করা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর-প্রণোদনা, বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এবং নতুন বিনিয়োগ পণ্য চালুর মতো নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে বিনিয়োগকারীদের অর্থ ও শেয়ারের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এসব উদ্যোগের প্রত্যাশিত সুফল অর্জন করা কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্টদের অভিমত, অপরিবর্তনযোগ্য ব্যাক-অফিস সফটওয়্যারের সফল বাস্তবায়ন এখন কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়; এটি পুঁজিবাজারে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই প্রযুক্তিগত সব ঘাটতি দ্রুত দূর করে সফটওয়্যারটি শতভাগ কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই।








