বিএসইসি চেয়ারম্যানের পদত্যাগের খবরে চাঙা শেয়ারবাজার

সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে দেশের শেয়ারবাজারে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা গেছে। দিনের শুরুতে মূল্যসূচক নিম্নমুখী থাকলেও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর বাজারে ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়। এর ফলে দিনের শেষভাগে ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় শেয়ারবাজারেই অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে যায় এবং মূল্যসূচক উল্লেখযোগ্য উত্থান নিয়ে লেনদেন শেষ করে।
বিজ্ঞাপন
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দিনের শুরুতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা থাকলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে পরিবর্তনের খবরে বাজারে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। এর প্রতিফলন দেখা যায় লেনদেন ও মূল্যসূচকে।
লেনদেনের শুরুতে বেশিরভাগ শেয়ার ও ইউনিটের দর কমতে থাকায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ঋণাত্মক অবস্থানে চলে যায়। তবে দুপুরের দিকে খবর আসে যে বিএসইসি চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদসহ কমিশনের চার সদস্য—মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ এবং মো. সাইফুদ্দিন দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাজারের চিত্র দ্রুত বদলে যায়। দরপতনের তালিকায় থাকা অনেক কোম্পানি ক্রমান্বয়ে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় চলে আসে। শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় অধিকাংশ সূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় লেনদেন শেষ হয়। এর মাধ্যমে টানা নবম কার্যদিবসের মতো পুঁজিবাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বজায় থাকল।
দিনশেষে ডিএসইতে ২৪২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ১০৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৫টির।
ভালো মানের এবং নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া ১৩৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বেড়েছে। বিপরীতে ৪২টির দর কমেছে এবং ১৯টি অপরিবর্তিত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মাঝারি মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যেও দরবৃদ্ধির প্রবণতা ছিল লক্ষণীয়। এই শ্রেণির ৪০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে, কমেছে ২৯টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৫টির।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন লভ্যাংশ না দেওয়ার কারণে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকা কোম্পানিগুলোর মধ্যেও ক্রয়চাপ লক্ষ্য করা গেছে। এই গ্রুপের ৬৬টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে, ৩৩টির কমেছে এবং ২১টির কোনো পরিবর্তন হয়নি।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতেও ইতিবাচক পরিস্থিতি দেখা গেছে। তালিকাভুক্ত ফান্ডগুলোর মধ্যে ১৮টির দর বেড়েছে, ৬টির কমেছে এবং ১০টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
বিজ্ঞাপন
দরবৃদ্ধির ফলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ৩৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৪৭৫ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে। একই সময়ে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১০৮ পয়েন্টে পৌঁছেছে। এছাড়া ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলো নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক ১১ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ৬৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যসূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা গেছে। ডিএসইতে এদিন মোট লেনদেন হয়েছে ১ হাজার ৩৫১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট। আগের কার্যদিবসে এই পরিমাণ ছিল ১ হাজার ২৭৯ কোটি ১৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে ৭২ কোটিরও বেশি টাকা।
বিজ্ঞাপন
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু চলতি বছরের সর্বোচ্চ লেনদেনই নয়, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বরের পর ডিএসইতে সর্বাধিক লেনদেনের ঘটনাও বটে। প্রায় নয় মাস পর বাজারে এমন উচ্চ লেনদেন বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল এনসিসি ব্যাংক, যার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে প্রায় ৩৪ কোটি টাকার। খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিল জেনেক্স ইনফোসিস, যার লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৩৪ কোটি টাকা। তৃতীয় স্থানে থাকা নাভানা ফার্মার শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২১ কোটির বেশি টাকার।
এছাড়া দিনের সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া কোম্পানির তালিকায় ছিল মনোস্পুল পেপার, মুন্নু সিরামিক, কাসেম ইন্ডাস্ট্রিজ, লাভেলো আইসক্রিম, যমুনা ব্যাংক, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং মীর আখতার হোসেন লিমিটেড।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৮২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। বাজারটিতে লেনদেনে অংশ নেওয়া ২৫৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৫২টির শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে ৭৪টির দর কমেছে এবং ২৯টির দর অপরিবর্তিত ছিল।
যদিও সিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এদিন সেখানে মোট লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, যেখানে আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৩১ কোটি ৮ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
এদিকে বিএসইসির নেতৃত্বে নতুন নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের পদত্যাগের পর ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ারের মাসুদ খানকে কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান এবং ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিজ-আল-তারিক।
সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনাররা যোগদানের তারিখ থেকে চার বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে মাসুদ খানকে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে তার কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। তার বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বিএসইসির নতুন নেতৃত্বের অধীনে নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ জোরদার হলে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও বাড়তে পারে।








