Logo

খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৬ জুলাই, ২০২৬, ১৮:৪২
খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে উদ্বেগজনক হারে বেড়ে চলা খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২১ দফার একটি বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য চলতি বছরের শেষ নাগাদ খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশে এবং আগামী বছরের শেষে তা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। এ পরিকল্পনায় ঋণ আদায়ে প্রণোদনার পাশাপাশি কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়ে এই পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে একাধিক বৈঠকে এ পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হয়েছে।

প্রথমে ছাড়, পরে কঠোর ব্যবস্থা

পরিকল্পনার প্রথম ধাপে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধে উৎসাহিত করতে বিদ্যমান এক্সিট পলিসি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। গত ২৯ জুন চালু হওয়া এ নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী জমা হওয়া সুদ এবং কিছু ব্যবস্থাপনা ব্যয় মওকুফ করতে পারবে, যাতে অন্তত মূল ঋণের অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

বিজ্ঞাপন

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, বর্তমানে চালু থাকা ঋণ পুনঃতফসিল নীতির বাইরে নতুন কোনো বিশেষ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়া হবে না। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নমনীয় শর্তে ঋণ নিষ্পত্তির সুযোগ থাকবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে আগামী বছর থেকে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে। এ জন্য ডিস্ট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট আইন প্রণয়ন এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে ঋণ আদায়সংক্রান্ত মামলা সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করা যায়।

বিজ্ঞাপন

বড় খেলাপিদের নাম প্রকাশের চিন্তা

বাংলাদেশ ব্যাংক এমন ঋণগ্রহীতাদের নাম ও ছবি প্রকাশের বিষয়ও বিবেচনা করছে, যারা নমনীয় সুযোগ পাওয়ার পরও ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবেন। সম্ভাব্যভাবে এসব তালিকা বিমানবন্দর, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় এবং শাখাগুলোতে প্রকাশ করা হতে পারে।

একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে প্রকৃত খেলাপি ঋণের ভিত্তিতে মূলধন ঘাটতি নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিচালকরা প্রয়োজনীয় মূলধন পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের মালিকানা হারানোর পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য কোনো ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

কোনো ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দীর্ঘদিন দুর্বল থাকলে সেটিকে ব্যাংক রেজুলেশন ফ্রেমওয়ার্ক-এর আওতায় এনে বিক্রি, একীভূতকরণ বা অবসায়নের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

কেন কঠোর হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকের বেশি সময়ে বিশেষ সুবিধার আওতায় বিপুল পরিমাণ ঋণ পুনঃতফসিল করা হলেও কাঙ্ক্ষিত আদায় নিশ্চিত হয়নি।

বিজ্ঞাপন

২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা হয়। শুধু গত বছরই পুনঃতফসিল হয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। কিন্তু এখনও প্রায় ৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা পুনঃতফসিল করা ঋণ অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।

সরকারি হিসাবে খেলাপি ঋণের হার বর্তমানে ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী সমস্যাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

এছাড়া ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতির কারণে সম্মিলিত মূলধন অনুপাত ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি রয়েছে ২০টি ব্যাংকে। গত বছর দেশের ৫২টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৭টি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, খেলাপি ঋণ কমানো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। বর্তমান নমনীয় সুযোগ কাজে লাগিয়ে যারা ঋণ পরিশোধ করবেন না, তাদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জামানত বিক্রি করলেও দায় শেষ হবে না

পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপে প্রস্তাবিত আইনের আওতায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি)-এর কাছে সমস্যাগ্রস্ত ঋণ হস্তান্তরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে জামানত বিক্রি করলেই ঋণগ্রহীতার দায় শেষ হবে না। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, কোনো ঋণগ্রহীতার মোট দেনা যদি ১ হাজার কোটি টাকা হয় এবং জামানত বিক্রি করে ১০০ কোটি টাকা পাওয়া যায়, তাহলে অবশিষ্ট ৯০০ কোটি টাকার দায়ও তাকে পরিশোধ করতে হবে।

ব্যাংকারদের প্রতিক্রিয়া

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, দীর্ঘদিন মামলা চালানোর চেয়ে আলোচনার মাধ্যমে ঋণ আদায় বেশি কার্যকর হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তার ভাষায়, ১০০ টাকা আদায়ে ১০ বছর অপেক্ষা করার চেয়ে কিছু ছাড় দিয়ে আজই ৮০ টাকা উদ্ধার করা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। তবে এই নীতির অপব্যবহার ঠেকাতে কার্যকর নজরদারিরও প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোর সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে জামানতের সঠিক মূল্যায়নের ওপর। কারণ অতীতে অনেক ঋণ অতিমূল্যায়িত বা দুর্বল জামানতের বিপরীতে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তিন ধাপে সংস্কার পরিকল্পনা

বাংলাদেশ ব্যাংকের রোডম্যাপে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

স্বল্পমেয়াদে উচ্চ খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকগুলোতে প্রম্পট কারেকটিভ অ্যাকশন (PCA) পুরোপুরি বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আধুনিকীকরণ, ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী নিয়োগে সুশাসন নিশ্চিত করা, ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ থাকা ব্যাংকের ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন এবং বড় খেলাপিদের ঋণ আদায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকবে।

মধ্যমেয়াদে বড় ঋণখেলাপিদের পরিচয় প্রকাশ, নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারীদের জন্য প্রণোদনা, স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জামানতের স্বাধীন মূল্যায়ন, আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু এবং ঋণ আদায়ে সফল কর্মকর্তাদের বিশেষ উৎসাহ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রম দ্রুততর করা, আদালতের স্থগিতাদেশ চাইলে ঋণের একটি অংশ আগে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, পুরো ব্যাংকিং খাতজুড়ে মোট ঋণের সীমা নির্ধারণ, এক হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংক ঋণের পরিবর্তে বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়া এবং আর্থিক বিরোধ নিষ্পত্তির বিচারিক প্যানেলে অভিজ্ঞ ব্যাংকারদের অন্তর্ভুক্ত করার মতো সংস্কার বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এদিকে, অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের খসড়া আইন ইতোমধ্যে জনমতের জন্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রস্তাবিত আইনে খেলাপি, অবলোপনকৃত এবং পুনঃতফসিল করেও অনাদায়ী থাকা ঋণগুলোকে সমস্যাগ্রস্ত সম্পদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এসব সম্পদ নগদ অর্থের বিনিময়ে কিনতে হলে এএমসিগুলোকে নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন বজায় রাখতে হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD