Logo

লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলকে পূবালী ব্যাংক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই, ২০২৬, ১৭:৩৬
লাখ কোটি টাকার আমানতের মাইলফলকে পূবালী ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের স্বাক্ষর রাখল বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানটির মোট আমানত এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। এর ফলে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় এবং সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশের পঞ্চম ব্যাংক হিসেবে ‘এক লাখ কোটি টাকার আমানত ক্লাব’-এ জায়গা করে নিল পূবালী ব্যাংক।

বিজ্ঞাপন

ব্যাংকটির সর্বশেষ আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহের শেষে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকা।

ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সতর্ক নীতির ফলেই এই মাইলফলক অর্জন সম্ভব হয়েছে।

বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে এক লাখ কোটি টাকার বেশি আমানত রয়েছে এমন ব্যাংকের সংখ্যা পাঁচটি। এগুলো হলো সোনালী ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক এবং সর্বশেষ পূবালী ব্যাংক। এর মধ্যে তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত এবং দুটি বেসরকারি ব্যাংক।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এক লাখ কোটি টাকার আমানত দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক সক্ষমতা ও গ্রাহক আস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক প্রথম এই মাইলফলক স্পর্শ করে। এরপর ২০২০ সালে বেসরকারি খাতের প্রথম প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ব্যাংক এই তালিকায় যুক্ত হয়। ২০২১ সালে অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকও এক লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। সর্বশেষ এই তালিকায় নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছে পূবালী ব্যাংক।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের আমানত প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। একই সময়ে জনতা ব্যাংকের আমানত ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪৯ কোটি এবং অগ্রণী ব্যাংকের আমানত ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

পূবালী ব্যাংকের আমানত বৃদ্ধির ধারা বিশেষভাবে নজর কেড়েছে গত কয়েক বছরে। ২০২২ সালের শেষে ব্যাংকটির আমানত ছিল প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকা। মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে সেই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে এক লাখ কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। গত বছরের শেষে আমানত ছিল ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বেড়ে ১ লাখ ৮০০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

ব্যাংকটির এই অগ্রগতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ এ কারণে যে, প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৬৩ বছরে যে পরিমাণ আমানত সংগ্রহ হয়েছিল, তার প্রায় সমপরিমাণ নতুন আমানত যুক্ত হয়েছে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে। ফলে ব্যাংকটির ব্যবসায়িক সম্প্রসারণ এবং গ্রাহকভিত্তির দ্রুত বৃদ্ধি দেশের ব্যাংকিং খাতে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

১৯৫৯ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক’ নামে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭১ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয় এবং নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পূবালী ব্যাংক। তবে জাতীয়করণের পর বিভিন্ন সময় ঋণ অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৮৪ সালের মধ্যে বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ খেলাপিতে পরিণত হয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে ১৯৮৪ সালে সরকার ব্যাংকটিকে পুনরায় বেসরকারি খাতে ফিরিয়ে দেয়। এরপর নতুন ব্যবস্থাপনায় ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং, দক্ষ জনবল গঠন, করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে ফিরে আসে।

শুধু আমানত নয়, ঋণ বিতরণেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে পূবালী ব্যাংক। গত বছরের হিসাবে ব্যাংকটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ১৪০ কোটি টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন

ঋণের গুণগত মানের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। দেশের ব্যাংকিং খাতে যেখানে খেলাপি ঋণের গড় হার প্রায় ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে পূবালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ। ফলে নিরাপদ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং সম্পদের মান রক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

বৈদেশিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পূবালী ব্যাংক। গত বছরে ব্যাংকটির মাধ্যমে প্রায় ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার রপ্তানি এবং ৪৭ হাজার ৩১৪ কোটি টাকার আমদানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। একই সময়ে প্রায় ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকার প্রবাসী আয় ব্যাংকটির মাধ্যমে দেশে এসেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আর্থিক কার্যক্রমের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে মুনাফাতেও। গত অর্থবছরে পূবালী ব্যাংক ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে, যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গ্রাহকসেবা সম্প্রসারণেও ধারাবাহিক বিনিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে সারা দেশে ব্যাংকটির ৫১৯টি শাখা এবং ২৯০টি উপশাখা রয়েছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি এটিএম এবং নগদ জমা ও উত্তোলন সুবিধাসম্পন্ন বুথের মাধ্যমে গ্রাহকদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে পূবালী ব্যাংক। তাদের নিজস্ব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পাই’ বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ সক্রিয় গ্রাহক ব্যবহার করছেন। এছাড়া সারা দেশে ২৫ হাজারের বেশি মার্চেন্ট পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) টার্মিনাল এবং প্রায় দেড় লাখ বাংলা কিউআর কোড স্থাপন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে নগদ অর্থ ছাড়াই বিভিন্ন ধরনের লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছে।

ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধার কারণে এখন গ্রাহকেরা ঘরে বসেই কয়েক মিনিটের মধ্যে নতুন হিসাব খুলতে পারছেন। ব্যাংকটির কর্মকর্তাদের মতে, এই আধুনিক ও সহজ সেবাই নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের আকৃষ্ট করছে এবং আমানত বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী বলেন, সারা দেশে বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক, আধুনিক ডিজিটাল সেবা, নিরাপদ ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনের গ্রাহক আস্থার ফলেই পূবালী ব্যাংক এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবার আরও সম্প্রসারণের মাধ্যমে ভবিষ্যতেও ব্যাংকটির প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD