ব্যবসার পরিবেশে গতি বাড়লেও দৃশ্যমান সুফল মেলেনি এখনো

বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম ছয় মাসে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর দৃশ্যমান সুফল এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের নেওয়া সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক হলেও সেগুলোর বাস্তব প্রভাব বুঝতে আরও সময় প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিতে নানা ধরনের চাপ ও সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়া, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিভিন্ন সময়ে মব সহিংসতার মতো ঘটনায় উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যবসায়ীরা দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি প্রত্যাশা করেছিলেন।
তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার কারণে দেশে জ্বালানি তেলের সংকট তৈরি হয়। প্রায় এক মাসের ভোগান্তির পর তেল সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলেও এরপর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নতুন করে শিল্প ও ব্যবসা খাতে চাপ তৈরি করেছে।
সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করছে এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াও পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীদের অনেকে। তবে জ্বালানি সংকটসহ মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘ লোডশেডিংয়ে ব্যাহত উৎপাদন
ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বর্তমানে অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ। রাজধানীতেও দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এতে দোকানপাট থেকে শুরু করে উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা পর্যন্ত নানা ধরনের সমস্যায় পড়ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য অনুযায়ী, বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বেড়েছে। শিল্পকারখানাগুলোতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার মালিক জানান, কয়েকটি দিনে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। একদিন ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন চালাতেও বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে পোশাক কারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তাঁর দাবি, বর্তমানে অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে।
সুফল পেতে আরও ছয় মাস সময় লাগতে পারে
বিজ্ঞাপন
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু মনে করেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলোর পূর্ণ সুফল পেতে আরও প্রায় ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো নীতি বা সংস্কার কার্যকর হওয়ার পরপরই তার ফল পাওয়া সম্ভব নয়। কিছু উদ্যোগের প্রভাব দ্রুত দেখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ফল পেতে সময় প্রয়োজন।
তাঁর মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন ব্যয় কমানোর চেষ্টা ইতোমধ্যে কিছুটা ফল দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক ও আলোচনা হচ্ছে এবং প্রধানমন্ত্রীও সরাসরি ব্যবসায়ীদের সমস্যা শুনছেন। এসব কারণে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
নতুন বিনিয়োগ এখনো চ্যালেঞ্জের
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ও ইফাদ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান তাসকীন আহমেদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
তিনি বলেন, এই মুহূর্তে নতুন বিনিয়োগের চেয়ে বিদ্যমান ব্যবসাগুলো টিকিয়ে রাখাই উদ্যোক্তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যবসায়ীদের মধ্যে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত আস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও চাঁদাবাজির নতুন ধরন, জ্বালানি সংকট এবং অন্যান্য বাস্তব সমস্যা উদ্বেগ তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর মতে, সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো এখনো ব্যবসায়ীদের হাতে সরাসরি সুফল হিসেবে পৌঁছায়নি।
তিন বছরে শত শত পোশাক কারখানা বন্ধ
দেশের শিল্প খাতের দুর্বল পরিস্থিতির আরেকটি চিত্র উঠে এসেছে পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে।
বিজ্ঞাপন
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকেও সংকটের কারণে কয়েক ডজন টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট, বাজার পরিস্থিতি ও রপ্তানিতে ধীরগতির কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো চাপের মধ্যে রয়েছে।
উদ্যোগে আগের তুলনায় গতি দেখছেন ব্যবসায়ীরা
বিজ্ঞাপন
তবে সব ব্যবসায়ী সরকারের প্রথম ছয় মাসকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন না। বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারম্যান ও ডিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান মনে করেন, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ ও কার্যক্রমে আগের তুলনায় গতি বেড়েছে।
তাঁর মতে, বাজেটে ব্যবসাবান্ধব কিছু প্রস্তাব রাখা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ বা ডি-রেগুলেশন নিয়েও কাজ হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের নিয়মিত বৈঠককেও তিনি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো সরাসরি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সমাধানের পথও দ্রুততর হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এআইটি সংশোধনসহ কয়েকটি উদ্যোগ ইতিবাচক
আবুল কাসেম খান গত ছয় মাসের কয়েকটি উদ্যোগকে বিশেষভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। এর মধ্যে বাজেটে অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স বা এআইটি সংশোধন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরকারের সরাসরি যোগাযোগ এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিয়মিত বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, এসব উদ্যোগের ফলাফল পুরোপুরি মূল্যায়ন করার জন্য আরও সময় প্রয়োজন।
অর্থনীতির মূল সূচকে বড় পরিবর্তন নেই
অন্যদিকে, বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি।
তাঁর মতে, সরকার সংস্কার, রাজস্বনীতি ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। বাজেটেও কিছু ইতিবাচক প্রস্তাব রয়েছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য গতি এখনো দেখা যাচ্ছে না।
তিনি বলেন, গত কয়েক বছর ধরে অর্থনীতিতে যে স্থবিরতা রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে সরকারের নেওয়া উদ্যোগের ফল পেতে কিছুটা সময় দেওয়া প্রয়োজন।
আমদানি-প্রতিস্থাপক ও রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা, সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন, লজিস্টিকস নীতির প্রয়োগ, বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সহজ করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তিনি।
আরও পড়ুন
তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রভাব এখনো অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে স্পষ্ট হয়নি বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।
জ্বালানি সংকট বড় বাধা
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকট এখন শিল্প ও বিনিয়োগের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে উঠেছে।
অনেক শিল্পকারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে আগে থেকেই বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তাদের কার্যক্রম পরিচালনাই কঠিন হয়ে পড়ছে। এমন অবস্থায় নতুন বিনিয়োগকারীরা কতটা আগ্রহী হবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তাঁর বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কিছুটা কমলেও ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত হওয়ার অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
সব মিলিয়ে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের তৎপরতা ও সংস্কারমূলক উদ্যোগে গতি দেখা গেলেও বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বিনিয়োগের স্থবিরতা ও বাজারের দুর্বলতার কারণে এর সুফল এখনো দৃশ্যমানভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছেনি। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা, নেওয়া সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের পাশাপাশি জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সমস্যার দ্রুত সমাধান হলে আগামী কয়েক মাসে ব্যবসার পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন স্পষ্ট হতে পারে।








