অর্ডার ও জ্বালানি সংকটে চাপে গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ খাত

তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয় ও নতুন ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পে। এর সঙ্গে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট যুক্ত হওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে ব্যয় এবং কমছে বিক্রি। ফলে পোশাকশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ পশ্চাৎমুখী সংযোগ খাতটিও বর্তমানে ধীরগতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাক কারখানায় অর্ডার কমলে বোতাম, জিপার, লেবেল, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন উপকরণের চাহিদাও স্বাভাবিকভাবে কমে যায়। আবার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অ্যাক্সেসরিজ প্রস্তুতকারকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
দেশের পোশাকের উপকরণ ও প্যাকেজিং শিল্প স্থানীয় তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৯০ শতাংশ উপকরণের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বিভিন্ন দেশে ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে। পরোক্ষ রপ্তানির মাধ্যমে এ খাতের রপ্তানি আয় ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বলে খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি।
পোশাকের অর্ডার কমলে প্রভাব পড়ে অ্যাক্সেসরিজে
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং খাত সরাসরি যুক্ত। পোশাক কারখানায় ক্রয়াদেশ কমে উৎপাদন কমলে আনুষঙ্গিক উপকরণের চাহিদাও কমে যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অর্ডার কমার প্রভাবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিক্রি, আয় ও উৎপাদন কমে যেতে পারে। একই সময়ে কোনো পোশাক কারখানা আর্থিক সংকটে পড়লে সরবরাহকারীদের বিল ও পাওনা পরিশোধে দেরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে অ্যাক্সেসরিজ ব্যবসায়ীদের নগদ অর্থের প্রবাহেও চাপ তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, কাঁচামাল, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শ্রমিকের ব্যয় বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তুলনামূলক কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপ রয়েছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং মুনাফার পরিমাণও কমছে।
উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে খরচ
বিজ্ঞাপন
বিপিএএমইএর পরিচালক ও বাদশা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম সবুজ বলেন, পোশাকের অর্ডার কমে যাওয়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও অ্যাক্সেসরিজ শিল্পের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরের মাধ্যমে উৎপাদন চালাতে হয়। এতে ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু বাড়তি এই ব্যয় পোশাক কারখানার কাছ থেকে সবসময় আদায় করা সম্ভব হয় না। ফলে একদিকে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
অর্ডার কম থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধেও উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নতুন অর্ডার আসতে শুরু করায় পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতির আশা করছেন উদ্যোক্তারা।
বিজ্ঞাপন
চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাকের উপকরণ সরবরাহকারী আদিল ট্রিমসের স্বত্বাধিকারী এস এম আরিফুর রহমান বলেন, একসময় ব্যবসায় ভালো গতি থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে পোশাকের উপকরণ সরবরাহের বাজারে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।
তার মতে, পোশাক রপ্তানিকারকদের অর্ডার কমে যাওয়ায় নতুন করে অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং পণ্যের চাহিদাও কমেছে। পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।
রপ্তানি খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধেও বিলম্ব হচ্ছে বলে জানান তিনি। এতে ব্যবসার স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নগদ অর্থের প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ছোট উদ্যোক্তাদের চাপ বেশি
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাজ কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও উৎপাদন কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে নিয়মিত মজুরি, কাঁচামাল কেনা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের নগদ অর্থের মজুত ও ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত হওয়ায় কয়েক মাস ধরে অর্ডার কম থাকা এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সংকট কাটাতে জ্বালানি ও অর্ডার বাড়ানোর তাগিদ
বিজ্ঞাপন
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, স্বল্পমেয়াদে শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী চালানো সম্ভব হবে এবং জেনারেটরসহ বিকল্প ব্যবস্থায় বাড়তি ব্যয়ও কমবে।
তবে শুধু জ্বালানি সরবরাহ ঠিক করলেই দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটবে না বলে মনে করছেন তারা। তৈরি পোশাকের নতুন অর্ডার বাড়ানো, রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং স্থানীয় অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পের সক্ষমতা ধরে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন।
উদ্যোক্তাদের দাবি, গার্মেন্টস অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিংকে কেবল পোশাকশিল্পের সহায়ক খাত হিসেবে দেখলে হবে না। দেশের তৈরি পোশাকের সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এ শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বজায় রাখতে জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসায়িক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং রপ্তানি অর্ডার বাড়ানোর উদ্যোগ সমন্বিতভাবে নেওয়া প্রয়োজন।








