অক্টোবরে জ্বালানি আমদানির তহবিল সংকটে বিপিসি

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্যের কারণে আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নতুন করে অর্থায়নের ব্যবস্থা না হলে আগামী অক্টোবরের কোনো এক সময়ে জ্বালানি আমদানির জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলার অর্থসংকটে পড়তে পারে সংস্থাটি।
বিজ্ঞাপন
সর্বশেষ ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, বিপিসির হাতে প্রায় ১২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকার কার্যকরী মূলধন রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে সেপ্টেম্বরের জ্বালানি আমদানির ব্যয় মেটানো সম্ভব হলেও পরবর্তী সময়ে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে।
বিপিসির হিসাবে, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখতে অন্তত দুই মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ কার্যকরী মূলধন থাকা প্রয়োজন। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারদর বিবেচনায় এই লক্ষ্যে সংস্থাটির আরও ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন।
তবে তহবিল সংকটের কারণে তাৎক্ষণিকভাবে দেশে জ্বালানি সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটবে না বলে আশা করছে বিপিসি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
গত ৮ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম সংস্থাটির আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
বিজ্ঞাপন
চিঠিতে বলা হয়, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিপিসির ২২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। এই অর্থ সরকারি ভর্তুকি হিসেবে চেয়েছে সংস্থাটি।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলেও দেশের বাজারে সে অনুযায়ী দাম সমন্বয় না হওয়ায় লোকসান বাড়ছে। দেশে জ্বালানির দাম নির্ধারণে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু থাকলেও মার্চের পর আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিয়মিত দাম সমন্বয় করা হয়নি।
সেপ্টেম্বরের জন্য বিপিসি ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ১৮৭ টাকা, অকটেন ১৫৪ টাকা, পেট্রোল ১৫০ টাকা এবং কেরোসিন ১৪৬ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছিল। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ দাম অপরিবর্তিত রেখে যথাক্রমে ১১৫ টাকা, ১৪৫ টাকা, ১৪০ টাকা ও ১৩৫ টাকা বহাল রাখে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিপিসির তথ্য বলছে, শুল্ক, কর ও পরিচালন ব্যয় বাদ দিয়ে গত আগস্টে জ্বালানি আমদানিতে ৭ হাজার ৬০৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এই ব্যয় ছিল ২ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা।
আমদানি ব্যয় মেটাতে বিপিসি এরই মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য রাখা তহবিল থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে। এতে প্রকল্পগুলোর অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৭৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা।
আগামী কয়েক মাসে বিপিসিকে আরও বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এলপিজি ট্যাংক স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণে সেপ্টেম্বরে প্রায় ৫২৪ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এ ছাড়া ডিসেম্বরের মধ্যে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে আরও ৬৯০ কোটি টাকা লাগবে।
বিজ্ঞাপন
বিপিসির চিঠিতে বলা হয়েছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় মেটাতেও প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে। পাশাপাশি ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইআইটিএফসি) ঋণের কিস্তিও সময়মতো পরিশোধ করতে হবে।
এর আগে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ভর্তুকি চেয়েছিল বিপিসি। তবে সেই অর্থ এখনো পাওয়া যায়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জমে থাকা লোকসানের অর্থ দ্রুত পরিশোধ এবং তাৎক্ষণিক তহবিল নিশ্চিত করতে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি ‘ডেমি-অফিসিয়াল’ (ডিও) চিঠি পাঠানোর প্রস্তাব করেছে বিপিসি। একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে ২০২৫ সালের জুন থেকে আমদানিকৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের শুল্ক ও কর নির্ধারণের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। আগে ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক-কর নির্ধারিত হলেও বর্তমানে প্রকৃত আমদানি মূল্য বা ইনভয়েস মূল্যের ভিত্তিতে তা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বিপিসির দাবি, এ পরিবর্তনের ফলে আগের ব্যবস্থার তুলনায় প্রতি লিটারে তাদের করের বোঝা প্রায় ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, আগস্টে ডিজেলের ওপর মোট শুল্ক ও করের পরিমাণ ছিল প্রতি লিটারে ৩২ টাকা ৪৪ পয়সা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এই পরিস্থিতিতে আগের শুল্ক কাঠামো পুনর্বহাল অথবা ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত সাময়িকভাবে শুল্ক ও কর মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছে বিপিসি। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে নিয়মিত জ্বালানির দাম সমন্বয়েরও আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, জ্বালানি আমদানি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকার এতদিন ভর্তুকি দিয়ে আসছে। তবে আগামী মাসগুলোতে আমদানি কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে বিপিসির অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে এবং জ্বালানি আমদানিতে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।’
রফিকুল ইসলাম আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি বিষয়কেই সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ভর্তুকির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছি এবং খুব দ্রুতই এর সমাধান হবে বলে আশা করছি।’








