Logo

রপ্তানি আয় বাড়লেও পোশাক খাতে সংকট, চাপে ছোট-মাঝারি কারখানা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:০৫
রপ্তানি আয় বাড়লেও পোশাক খাতে সংকট, চাপে ছোট-মাঝারি কারখানা
ছবি: সংগৃহীত

পরিসংখ্যানে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও খাতটির সংকট কাটেনি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে পোশাক রপ্তানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়েছে। তবে শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, আগের বছরের তুলনামূলক কম রপ্তানির কারণে প্রবৃদ্ধির হার বেশি দেখাচ্ছে। বাস্তবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি ব্যয় এবং ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখার চাপ এখনো রয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বাংলাদেশ থেকে ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এ আয় ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। সেপ্টেম্বর মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

তবে মাসভিত্তিক হিসাব বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। চলতি বছরের জুলাইয়ে পোশাক রপ্তানি আয় ছিল ৩৮৮ কোটি ৬৭ লাখ ডলার। আগস্টে তা কমে দাঁড়ায় ৩৬০ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে, যা জুলাইয়ের তুলনায় ৭ দশমিক ১৫ শতাংশ কম। সেপ্টেম্বরে রপ্তানি আয় আরও কমে ৩০৮ কোটি ২৯ লাখ ডলারে নেমে আসে। আগস্টের তুলনায় এ পতনের হার ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় ইপিবির হিসাবে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। এ পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যবসায়িক পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে আসা যাবে না।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, সময়মতো পণ্য পাঠাতে গিয়ে পোশাক কারখানাগুলোকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এতে আর্থিক ক্ষতি হলেও ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে হচ্ছে। তাই শুধু রপ্তানি আয় বা পরিমাণ নয়, বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

মাহমুদ হাসান খান জানান, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে জ্বালানি সংকট ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। আগে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করে উৎপাদন ও জাহাজীকরণের প্রস্তুতি নেওয়া গেলেও এখন সময়মতো পণ্য পাঠাতে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে।

এতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত মজুরি দিতে হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজেল কেনা, অতিরিক্ত গ্যাস ব্যবহার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আকাশপথে পণ্য পাঠানোর মতো ব্যয়বহুল বিকল্প নিতে হচ্ছে কারখানাগুলোকে। ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে এসব আর্থিক ক্ষতি মেনে নিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে নতুন অর্ডার হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিজিএমইএর সহসভাপতি ও এমিটি ডিজাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শিহাব উদ্দোজা চৌধুরী বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে অধিকাংশ কারখানা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারেনি। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় এবার প্রবৃদ্ধি বেশি দেখাচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমানে যে রপ্তানি আয় দেখা যাচ্ছে, তা স্বাভাবিক সময়ের গড় আয়ের চেয়েও কম।

ইপিবির তথ্য বলছে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান বাজারের পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বেড়েছে ৯ দশমিক ৪০ শতাংশ। ফলে মোট পোশাক রপ্তানিতে এসব বাজারের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ১৩ শতাংশে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, আগস্টজুড়ে জ্বালানি সংকট থাকা সত্ত্বেও ইপিবির হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানি কম থাকায় এবার প্রবৃদ্ধি বেশি দেখাচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তাঁর ভাষ্য, বড় কারখানাগুলো আর্থিক ক্ষতি মেনে বিপুল পরিমাণ ডিজেল এবং নিজস্ব উৎস থেকে এলপিজি কিনে উৎপাদন চালু রেখেছে। এতে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা কিছুটা বজায় থাকায় রপ্তানিও অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়েছে। তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি পরিসংখ্যানের চেয়ে ভিন্ন।

ফজলে শামীম এহসান বলেন, প্রকৃত অবস্থা বুঝতে শুধু রপ্তানি আয়ের হিসাব দেখলে চলবে না। কর্মসংস্থান বাড়ছে কি না এবং কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, নাকি কমছে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। তাঁর মতে, বড় কারখানাগুলো আরও বড় হলেও ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ প্রবণতা শুধু রপ্তানি খাতের জন্য নয়, পুরো অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগজনক।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিকাশ সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে। তাই কারখানাগুলো উৎপাদন ও রপ্তানি ধরে রাখতে পারছে কি না, ব্যবসায় টিকে থাকার সক্ষমতা এবং আর্থিক সুরক্ষা বাড়ছে কি না, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

ইপিবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ওভেন পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। একই সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

অন্যদিকে, বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ সময়ে নিট পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।

সংগঠনটির মতে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, চাহিদা কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি এবং দেশীয় রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস ইউরোপের বাজারে রপ্তানি কমার অন্যতম কারণ। সব মিলিয়ে, পরিসংখ্যানে প্রবৃদ্ধি থাকলেও উৎপাদন ব্যয়, জ্বালানি সংকট ও ছোট-মাঝারি কারখানার দুর্বলতা বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD