জ্বালানিতে বেসরকারি খাত: বাজার নয়, আগে আস্থার পরীক্ষা হোক

জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রশ্নে বিতর্ক এখন মূলত দুই মেরুতে। বেসরকারি খাত এলে বিনিয়োগ ও দক্ষতা বাড়বে কি না, আর তাতে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য হয়তো প্রশ্নটি এভাবে দেখার প্রয়োজন নেই যে জ্বালানি খাত সরকারি থাকবে, না বেসরকারি হবে। বরং ভাবা দরকার, বেসরকারি খাতকে কোন পর্যায়ে, কতটুকু এবং কীভাবে যুক্ত করলে তাদের সক্ষমতাও কাজে লাগবে, আবার রাষ্ট্রও নিজের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারাবে না।
বিজ্ঞাপন
শুরুতেই আমদানি, মজুত ও বিপণন, তিনটি ক্ষেত্র একসঙ্গে খুলে দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিই আগে বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথম পর্যায়ে যোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে জ্বালানি আমদানির সুযোগ দেওয়া হোক। তারা নিজেদের অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করবে এবং সরাসরি সরকার নির্ধারিত ডিপোতে পৌঁছে দেবে। সরকার সেই জ্বালানি মজুত ও বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিতরণ করবে এবং বিক্রির পর চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ করবে।
এতে একটি ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। জ্বালানি সংগ্রহে বেসরকারি খাতের অর্থ ও দক্ষতা কাজে লাগবে, কিন্তু দেশের মজুত ও বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে রাষ্ট্রের হাতে।
বিজ্ঞাপন
এ ধরনের ব্যবস্থা আমাদের কাছে একেবারে অচেনাও নয়। বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে বিনিয়োগ করলেও উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি নিজের মতো করে খুচরা বাজারে বিক্রি করে না; একটি নির্ধারিত রাষ্ট্রীয় ক্রয়ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। জ্বালানির ক্ষেত্রেও অন্তত শুরুর কয়েক বছর একই ধরনের কাঠামো নিয়ে ভাবা যেতে পারে।
এই ব্যবস্থার জন্য একটি নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণকাল রাখা যেতে পারে। সেটি পাঁচ, সাত কিংবা দশ বছর, কতটা হওয়া উচিত, তা বিশেষজ্ঞরা নির্ধারণ করবেন। এই সময়েই বোঝা যাবে কোন প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও নিয়মিত সরবরাহ ধরে রাখতে পারে, কার আর্থিক সক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদি এবং সংকটের সময় কে তার চুক্তির দায়বদ্ধতা বজায় রাখে। বাজারে বড় দায়িত্ব দেওয়ার আগে তাই অনুমান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কাজের রেকর্ডই হোক একটি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাইয়ের ভিত্তি।
জ্বালানি খাতে কোনো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা শুধু আর্থিক প্রস্তাব বা কাগুজে যোগ্যতা দিয়ে পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব নয়; তার আসল পরীক্ষা হয় সংকটের সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে।
বিজ্ঞাপন
একটি দীর্ঘ পর্যবেক্ষণকাল আরও একটি বিষয় পরিষ্কার করবে, কারা সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হতে চায়। যারা বছরের পর বছর নিজেদের অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে, ভবিষ্যতে বাজারে তাদের বড় ভূমিকা দেওয়ার সিদ্ধান্তও তখন বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নেওয়া সম্ভব হবে।
এরপরও একবারে পুরো বাজার খুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। দীর্ঘদিন সফলভাবে সরবরাহের দায়িত্ব পালন করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রথমে নির্দিষ্ট এলাকা বা সীমিত পরিসরে বিতরণের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সেখানে তাদের মূল্য, সরবরাহের ধারাবাহিকতা ও বাজারে আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হবে। অভিজ্ঞতা সন্তোষজনক হলেই কেবল ধাপে ধাপে তাদের বাজারের পরিধি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ বাজারে বড় অংশীদার হওয়ার সুযোগ আগে নয়, আগে দায়িত্বশীলতার প্রমাণ।
তবে এই ব্যবস্থায় দায়িত্ব শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নয়, রাষ্ট্রেরও। জ্বালানির মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি কীভাবে সামলানো হবে, কখন ও কীভাবে সরবরাহকারীর পাওনা পরিশোধ করা হবে এবং জ্বালানির মান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, এসব শর্ত শুরুতেই স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। রাষ্ট্র একদিকে বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারীর কাছে একটি নির্ভরযোগ্য ক্রেতা হিসেবেও তার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশকে এখনই আগামী কয়েক দশকের জ্বালানি বাজারের চূড়ান্ত কাঠামো ঠিক করে ফেলতে হবে, এমন কোনো তাড়া থাকার কথা নয়। বরং ধাপে ধাপে এগিয়ে কয়েক বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই বেশি যুক্তিসংগত। এই সময় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ পাবে, তেমনি রাষ্ট্রও বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারবে। এরপর বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ঠিক করা যেতে পারে, বেসরকারি খাতকে কতটা এবং কোন পর্যায় পর্যন্ত বাজারে সুযোগ দেওয়া হবে।
জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার ডিপো, মজুত বা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যায় নয়। আসল শক্তি হলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ধরে রাখা, যাতে কোনো সংকটেই জ্বালানি সরবরাহের জন্য রাষ্ট্রকে কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর শর্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে না হয়।
বেসরকারি বিনিয়োগের পথ অবশ্যই খোলা থাকতে পারে। তাদের মূলধন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও জ্বালানি সংগ্রহের সক্ষমতাও দেশের কাজে লাগানো যেতে পারে। তবে শুরুতেই আমদানি, মজুত ও খুচরা বিপণনের পুরো ব্যবস্থা তাদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
বিজ্ঞাপন
প্রথমে সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হোক। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় যারা সক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ দেবে, তাদের অংশগ্রহণ ধাপে ধাপে বাড়ানো যেতে পারে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি হবে, আবার রাষ্ট্রকেও শুরুতেই জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে হবে না।
জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে সংস্কার প্রয়োজন, তবে সেই সংস্কার এমন হওয়া উচিত, যাতে বিনিয়োগের পথ খুললেও সংকটের দিনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শেষ ক্ষমতাটি রাষ্ট্রের হাতেই থাকে।
পারভেজ আবীর চৌধুরী
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি








