Logo

কবি কাজী নজরুল ইসলাম: ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৩ আগস্ট, ২০২৬, ১২:০৪
কবি কাজী নজরুল ইসলাম: ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী কবি’ নামে পরিচিত। তাঁর কাব্যসাধনায় বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে। তাঁর বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় অন্যায়, শোষণ ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে যে দুর্বার উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছে, তার কারণেই তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। একই সঙ্গে তিনি মানবতার কবি, সাম্যের কবি ও যৌবনের কবি।

বিজ্ঞাপন

কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে (বাংলা ১৩০৬ সনের ১১ জ্যৈষ্ঠ) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবেই পিতৃহারা হওয়ায় দারিদ্র্য ও অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে তাঁর বেড়ে ওঠা। প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর কবি-প্রতিভার বিকাশ ঘটে। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা লাভ করেন।

দশ বছর বয়সে গ্রামের মক্তব থেকে নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর কিছুদিন সেখানে শিক্ষকতা করেন। এগারো বছর বয়সে জীবিকার প্রয়োজনে লেটোর দলে যোগ দেন। লেটোর দলেই তাঁর সাহিত্যচর্চার সূচনা। গান, কবিতা, যাত্রা ও নাটক রচনা করে তিনি গ্রামে গ্রামে অভিনয় করতেন। কিছুদিন স্থানীয় মসজিদে ইমামতিও করেন। সংসারে অভাব তীব্র হলে আসানসোলে একটি রুটির দোকানেও কাজ করেন। পরে আসানসোল থানার দারোগা হাফিজ উদ্দিনের সহযোগিতায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দরিরামপুর হাইস্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রজীবনেই কথাসাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।

কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতাকামী। ১৯১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি ৪৯ নম্বর বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন। সৈনিকজীবনেও তাঁর সাহিত্যসাধনা অব্যাহত ছিল। সেখানে এক পাঞ্জাবি মৌলভির কাছে ফার্সি ভাষা শেখেন এবং ফার্সি সাহিত্যের বহু গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। হাফিজের কবিতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ সৃষ্টি হয়। করাচির সৈনিকজীবনেই তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার বিকাশ ঘটে। এ সময় তিনি কবিতা, গান ও গল্প রচনা করেন।

বিজ্ঞাপন

১৯২০ সালে কলকাতায় ফিরে নজরুল পুরোপুরিভাবে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কাজী মোতাহের হোসেন, মোজাম্মেল হক, কাজী আবদুল ওদুদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ সমকালীন বহু সাহিত্যিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তাঁর প্রথম প্রকাশিত গদ্যরচনা ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’ ১৯১৯ সালে প্রকাশিত হয়। একই বছর ‘মুক্তি’ কবিতার মাধ্যমে কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি আরও বিস্তৃত হয়।

নজরুলের সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। ১৯২১ সালের শেষদিকে রচিত এই কবিতা ১৯২২ সালে ‘মোসলেম ভারত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কবিতার শুরুতেই তাঁর সেই অমর উচ্চারণ—

“বল বীর—

বিজ্ঞাপন

বল উন্নত মম শির।”

এই কবিতায় নজরুল নিজেকে শুধু একজন ব্যক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেননি; বরং তিনি অন্যায়, শোষণ, পরাধীনতা ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন বিদ্রোহী সত্তাকে ধারণ করেছেন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের গান ও কবিতা মানুষের মধ্যে নতুন প্রাণসঞ্চার করেছিল। ১৯২২ সালে তিনি ‘ধূমকেতু’ নামে একটি অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। সাম্রাজ্যবাদ ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর লেখনী ছিল অত্যন্ত তীব্র। ফলে ব্রিটিশ সরকার তাঁর ওপর কঠোর নজরদারি শুরু করে। ১৯২২ সালের ২৩ নভেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগারে থাকাকালে তিনি রচনা করেন ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

কারাগারও তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বন্দিজীবনেও তিনি গান ও কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর বিখ্যাত গান ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ স্বাধীনতা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বসন্ত’ নাটক নজরুলকে উৎসর্গ করে পাঠিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সম্পর্ক ছিল।

প্রচলিত সংস্কার, অন্যায়, বৈষম্য ও রাজনৈতিক-সামাজিক শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছিল নজরুলের সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। দাসত্ব, পরাধীনতা ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর উচ্চারণ ছিল বজ্রকণ্ঠের মতো। নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তিনি ছিলেন সোচ্চার। মানুষের মর্যাদাকেই তিনি সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন।

নজরুলের সাম্যবাদী চেতনার অনন্য প্রকাশ তাঁর ‘মানুষ’ কবিতায়—

বিজ্ঞাপন

“গাহি সাম্যের গান—

মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!”

আরও লিখেছেন—

বিজ্ঞাপন

“নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,

সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”

এই কয়েকটি পঙ্‌ক্তির মধ্যেই নজরুলের বিশ্বমানবতার দর্শন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও দেশের বিভেদ ভুলে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখাই ছিল তাঁর মূল শিক্ষা।

বিজ্ঞাপন

দেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় আন্দোলনে যুবসমাজের ভূমিকার ওপর নজরুল বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নিপীড়িত ও অধঃপতিত মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে তিনি অসংখ্য কবিতা ও গানে যৌবনের শক্তির জয়গান করেছেন। এ কারণেই তিনি বাংলা সাহিত্যে ‘যৌবনের কবি’ হিসেবেও পরিচিত। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও নারী—সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি ও শক্তি তাঁর সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে।

নজরুল ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, সুরকার, সংগীতশিল্পী, সাংবাদিক, সম্পাদক ও অভিনয়শিল্পী। চলচ্চিত্রের সঙ্গেও তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে তিনি গান লিখেছেন, সুর করেছেন, অভিনয় করেছেন এবং কণ্ঠও দিয়েছেন। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তিনি গান রচনা ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন।

বাংলা গানে ফার্সি গজলের সফল প্রবর্তনেও নজরুলের অবদান অনস্বীকার্য। হামদ, নাত, গজলসহ অসংখ্য ইসলামী সংগীত রচনা করেছেন তিনি। তাঁর বিখ্যাত গান ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’ আজও বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানবতাবাদী। হিন্দু ধর্মীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় নিয়েও তিনি লিখেছেন। শ্যামাসংগীত, ভজন ও কীর্তন রচনা করেছেন। হিন্দু নারী প্রমীলা দেবীকে বিয়ে করে তিনি সামাজিক ও ধর্মীয় সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছিলেন। তাঁর ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতায় মানবতার যে আহ্বান ধ্বনিত হয়েছে, তা আজও প্রাসঙ্গিক—

“হিন্দু না ওরা মুসলিম? ওই জিজ্ঞাসে কোনজন?

কাণ্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার!”

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কবি নজরুল ইসলামকে সপরিবারে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তাঁকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ১৯৭৬ সালে তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

জীবনের শেষ অধ্যায়টি ছিল গভীর বেদনার। ১৯৪২ সালের পর থেকে দুরারোগ্য অসুস্থতার কারণে তিনি ধীরে ধীরে বাক ও বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন নীরব জীবন কাটানোর পর ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। বাংলা তারিখ ছিল ১৩৮৩ সনের ১২ ভাদ্র। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

মসজিদের পাশে কবর দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তিনি নিজেই প্রকাশ করেছিলেন—

বিজ্ঞাপন

“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই,

যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।”

কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর জীবদ্দশায় মাত্র প্রায় দুই দশকের কিছু বেশি সময় সক্রিয়ভাবে সাহিত্যসৃষ্টি করতে পেরেছেন। কিন্তু এই স্বল্প সময়েই তিনি কবিতা, গান, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও উপন্যাসসহ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘অগ্নিবীণা’, ‘দোলনচাঁপা’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘বুলবুল’, ‘জিঞ্জীর’, ‘সর্বহারা’ ও ‘সঞ্চিতা’। গল্পগ্রন্থের মধ্যে ‘ব্যথার দান’ ও ‘রিক্তের বেদন’, নাটকের মধ্যে ‘আলেয়া’ ও ‘ঝিলিমিলি’ এবং উপন্যাসের মধ্যে ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘বাঁধনহারা’ ও ‘কুহেলিকা’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে তাঁর অমর গান ‘চল্ চল্ চল্’। তাঁর সাহিত্যকর্ম আজও বাঙালির জাতীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে।

কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একজন কবি নন; তিনি একটি চেতনার নাম, একটি বিদ্রোহের নাম, একটি মানবিক দর্শনের নাম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ, সাম্যের পক্ষে তাঁর অবস্থান এবং মানুষকে ভালোবাসার যে শিক্ষা তিনি দিয়ে গেছেন, তা সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। তাই তিনি আজও বাঙালির হৃদয়ে অমর। সত্যিই—ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

রোকন উদ্দীন আহমদ

স্বাক্ষরিত/তারিখ: ২৩/০৮/২০২৬ খ্রি.

চট্টগ্রাম

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD