তারা ভরা রাতে তোমার কথা মনে পড়ে

বাংলা গানের ইতিহাসে কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের নাম। তাঁর দরদমাখা কণ্ঠে দেশপ্রেম, ভালোবাসা, বিরহ ও মানুষের জীবনের নানা অনুভূতি পেয়েছে অনন্য প্রকাশ। তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, কিন্তু তাঁর গান আজও বাঙালির হৃদয়ে জীবন্ত। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁর কণ্ঠের গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনুপ্রেরণা জোগাবে।
বিজ্ঞাপন
‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গান আবদুল জব্বারকে মানুষের মনে স্থায়ী আসন দিয়েছে।
১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর বাউল ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের জেলা কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এই ক্ষণজন্মা শিল্পী। লালন শাহের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার উদার সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে তাঁর সংগীতের সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবন ও অনুভূতির গভীর সংযোগ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি হয়ে ওঠেন গণমানুষের শিল্পী।
ঢাকার বেতারে সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আবদুল জব্বারের পেশাগত সংগীতজীবনের বিস্তার ঘটে। রাজশাহী ও রংপুর বেতারের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তা নাজমুল আলম কুষ্টিয়ায় গিয়ে এক অনুষ্ঠানে তাঁর কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হন। তাঁর উদ্যোগেই আবদুল জব্বার ঢাকা বেতারে শিল্পী হিসেবে সুযোগ পান।
বিজ্ঞাপন
এরপর ধীরে ধীরে তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে বেতার, চলচ্চিত্র ও সংগীতাঙ্গনে। ১৯৬২ সালে চলচ্চিত্রে প্রথম গান করার পর ১৯৬৪ সালে উর্দু চলচ্চিত্র ‘সঙ্গম’-এ প্লেব্যাক করে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। এরপর চলচ্চিত্রে তাঁর গানের সুযোগ আরও বাড়তে থাকে।
ষাটের দশকে বাংলা আধুনিক গানের যে বিকাশ ঘটেছিল, আবদুল জব্বার ছিলেন সেই সময়ের অন্যতম শক্তিশালী পুরুষ কণ্ঠ। রোমান্টিক, বিরহ ও দেশাত্মবোধক—বিভিন্ন ধারার গান তিনি সমান দক্ষতায় পরিবেশন করেছেন।
১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে আবদুল জব্বার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। রাজপথে গান গেয়ে তিনি আন্দোলনকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন। একই সময়ে ‘বিমূর্ত’ নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং গড়ে তোলেন বঙ্গবন্ধু শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটির সভানেত্রী ছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
বিজ্ঞাপন
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর তিনি ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় যান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর কণ্ঠ হয়ে ওঠে স্বাধীনতাকামী মানুষের সাহস ও প্রেরণার অন্যতম উৎস।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তাঁর কণ্ঠে একের পর এক দেশাত্মবোধক গান প্রচারিত হতো। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘আমি এক বাংলার মুক্তিসেনা’, ‘মুজিব বাইয়া যাওরে’, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আর একটি নাম—মুজিবর’সহ তাঁর পরিবেশিত গান মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে গভীর প্রেরণা সৃষ্টি করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস তাঁর গান মানুষের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র করে তোলে। পরবর্তী সময়ে আবদুল জব্বার নিজেই বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় গান গাওয়া তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুকে তিনি পিতৃতুল্য মনে করতেন এবং ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করতেন। বঙ্গবন্ধুও তাঁকে স্নেহ করতেন।
চলচ্চিত্রের গান আবদুল জব্বারের জনপ্রিয়তাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ১৯৬৮ সালের ‘এতটুকু আশা’ চলচ্চিত্রে তাঁর গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি শ্রোতাদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। সুরকার সত্য সাহার সুরে তাঁর আবেগঘন পরিবেশনা গানটিকে কালজয়ী করে তোলে।
তবে আবদুল জব্বারের নাম উচ্চারিত হলে যে গানটি সবার আগে মনে পড়ে, সেটি হলো ‘ওরে নীল দরিয়া’। শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়। আবদুল্লাহ আল মামুন পরিচালিত ওই চলচ্চিত্রে প্রবাসী নাবিকের স্ত্রী ও জন্মভূমির প্রতি আকুলতা ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানের মাধ্যমে অসাধারণভাবে ফুটে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৮ সালের ‘সারেং বউ’ চলচ্চিত্রের এই গান আবদুল জব্বারকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। তাঁর কণ্ঠে ‘এতটুকু আশা’, ‘সারেং বউ’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কলমিলতা’, ‘মানুষের মন’, ‘স্বপ্ন দিয়ে ঘেরা’, ‘ঝড়ের পাখি’, ‘আলোর মিছিল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘তুফান’ ও ‘অঙ্গার’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রের গান শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।
বাংলাদেশের আধুনিক গানের স্বর্ণযুগে আবদুল জব্বার ছিলেন অন্যতম প্রধান শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে তৈরি হয়েছে প্রেম, বিরহ ও আবেগের অসংখ্য গান। ‘তারা ভরা রাতে তোমার কথা যে মনে পড়ে বেদনায়’, ‘আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন’, ‘কপোলের কালো তিল পড়বে চোখে’, ‘একবুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও’, ‘আমার এই চোখ দুটি আয়না করে’, ‘ভাবনা আমার আহত পাখির মতো’, ‘মনরে ভবের নাট্যশালায় মানুষ চেনা দায়’, ‘আমার আকাশে আজ মেঘ করেছে’—এসব গান তাঁকে শ্রোতাদের কাছে আরও প্রিয় করে তোলে।
তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল আবেগ প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতা। একটি গানকে শুধু সুর ও শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি সেটিকে শ্রোতার অনুভূতির অংশ করে তুলতে পারতেন।
বিজ্ঞাপন
আবদুল জব্বারের সংগীতজীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দেশের প্রতি তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিভিন্ন স্থানে গান গেয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে এবং অর্থ সংগ্রহে ভূমিকা রাখেন। সে সময় গান গেয়ে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ তিনি বাংলাদেশ সরকারের তহবিলে জমা দিয়েছিলেন।
জীবনের শেষদিকে অসুস্থ অবস্থায় আর্থিক সংকট তাঁকে ভোগালেও তিনি মানুষের করুণা চাননি। তাঁর জীবনযাপন ছিল সহজ-সরল এবং সংগীতের প্রতি ছিল গভীর নিষ্ঠা। ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়ে বাংলা গানের উৎকর্ষ সাধন ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
সংগীতে অবদানের জন্য আবদুল জব্বার নানা পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক এবং ২০০৩ সালে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৮০ সালে একুশে পদক এবং ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে।
বিজ্ঞাপন
২০০৬ সালে বিবিসি বাংলার শ্রোতা জরিপে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানের তালিকায় তাঁর গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ এবং ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’—এই তিনটি গান স্থান পায়। এটি তাঁর সংগীতজীবনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।
জীবনের শেষ প্রান্তে ২০১৭ সালে তাঁর প্রথম মৌলিক গানের অ্যালবাম ‘কোথায় আমার নীল দরিয়া’ প্রকাশিত হয়। একই বছর ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন বাংলা গানের এই কিংবদন্তি শিল্পী।
পাঁচ দশকেরও বেশি সময় সংগীতের ভুবনে আলো ছড়ানো আবদুল জব্বার আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু একজন শিল্পীর প্রকৃত মৃত্যু হয় না, যদি তাঁর সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ থেকে ‘ওরে নীল দরিয়া’, ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ থেকে ‘তারা ভরা রাতে তোমার কথা মনে পড়ে’—তাঁর গান বাঙালির আবেগ, দেশপ্রেম ও স্মৃতির সঙ্গে মিশে থাকবে যুগের পর যুগ।
বিজ্ঞাপন
আবদুল জব্বার তাই শুধু একজন কণ্ঠশিল্পী নন; তিনি বাংলাদেশের সংগীত ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল কণ্ঠসাক্ষী। তাঁর কণ্ঠের গান বাঙালির হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
রোকন উদ্দীন আহমদ
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট








