Logo

হীরক রাজার দেশ নয় তো বাংলাদেশ?

profile picture
পারভেজ আবীর
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৩০
হীরক রাজার দেশ নয় তো বাংলাদেশ?
ফাইল ছবি।

সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুকে বিদ্যুৎমন্ত্রীকে নিয়ে একটি মন্তব্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। “লাইন লম্বা, এই কারণে বিদ্যুৎ চলে যায়”, এই বাক্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা মিম, পোস্ট ও হাস্যরস। অনেকেই সেটিকেই তাঁর হুবহু বক্তব্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তিনি কি আসলেই তা বলেছিলেন?

বিজ্ঞাপন

জাতীয় সংসদে ৭ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার সময় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “মাননীয় মন্ত্রীর কাছ থেকে শুনি, তার লম্বা, এই কারণে বিদ্যুৎ চলে যায়।” এতে মনে হতে পারে, বিদ্যুৎমন্ত্রী বুঝি লাইন লম্বা হওয়ার সঙ্গে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক টেনেছেন।

কিন্তু ইন্ডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে ৫ মে প্রকাশিত ভিডিওতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে বলতে শোনা যায়, “সোজা কথা, গ্রামে লোডশেডিং নাই। আমাদের পল্লীবিদ্যুতের লাইন তো লম্বা লম্বা। কোথাও ফল্ট করলে তা বের করতে সময় লাগে।”

তাঁর বক্তব্য ছিল দীর্ঘ পল্লী বিদ্যুৎলাইনে কারিগরি ত্রুটি হলে সেটি শনাক্ত করতে সময় লাগা নিয়ে। সংসদে উদ্ধৃত অংশে ‘ফল্ট’ শব্দটি নেই। একটি শব্দ বাদ পড়েছে, অথচ তাতেই অর্থটি বদলে গেছে।

বিজ্ঞাপন

মানুষের বিদ্যুৎ-দুর্ভোগ নিয়ে সংসদে প্রশ্ন উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। বরং প্রশ্ন না উঠলেই উদ্বেগের কারণ ছিল। একজন মন্ত্রীর ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না হলে তাঁকে কঠিন প্রশ্ন করা যেতে পারে। তথ্য দিয়ে তাঁর বক্তব্য ভুলও প্রমাণ করা যেতে পারে। কিন্তু তিনি যা বলেননি, তা তাঁর নামে বলা হলে মূল সমস্যাটিই আড়ালে পড়ে যায়।

সত্যজিৎ রায়ের কাল্পনিক হীরক রাজ্যে ক্ষমতাবানের কথাই সত্য ছিল। ইচ্ছা করলে অন্যের মুখের কথাও বদলে দেওয়া যেত। বাংলাদেশ নিশ্চয়ই হীরক রাজার দেশ নয়। ডেপুটি স্পিকার ও বিদ্যুৎমন্ত্রী, দুজনই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। কে বেশি ক্ষমতাবান, সেই হিসাব এখানে অর্থহীন। আসল কথা হলো, ক্ষমতার জায়গায় বসে কারও বক্তব্য নিজের সুবিধামতো বদলে বলার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

তবে এখানেই আলোচনা শেষ করলে বিদ্যুৎ না পাওয়া মানুষের প্রতি অবিচার হবে। গ্রামের একটি বাড়িতে সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে পরিবারটি জানতে চায় না, এর নাম লোডশেডিং, উৎপাদনঘাটতি, নাকি লাইনের ত্রুটি। তাদের কাছে ঘর অন্ধকার হওয়াটাই সত্য। ফলে মন্ত্রী শুধু ‘লোডশেডিং নেই’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

বিজ্ঞাপন

কোথায় পরিকল্পিত লোডশেডিং হচ্ছে, কোথায় জ্বালানির অভাব, আর কোথায় কারিগরি ত্রুটি, সরকারকে সেই হিসাব পরিষ্কারভাবে দিতে হবে। ত্রুটি সারাতে কত সময় লাগছে এবং কেন লাগছে, সেটিও মানুষকে জানানো দরকার।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়া নির্বাচিত সরকার প্রায় ছয় মাস পার করেছে। এই সময়ের মধ্যে এমন কোনো বড় শিল্প বা অবকাঠামো তৈরি হয়নি, যার নতুন চাহিদায় হঠাৎ বিদ্যুৎব্যবস্থায় সংকট দেখা দেওয়ার কথা। বরং বিগত ১৭ বছরের আমদানিনির্ভর জ্বালানির নীতি, দুর্বল সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা, ব্যয়বহুল চুক্তি এবং অদক্ষ পরিকল্পনার প্রভাব আজও বিদ্যুৎ খাতে রয়ে গেছে। তাই অতীতের নীতি, চুক্তি ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

কিন্তু পুরোনো দায় দেখিয়ে বর্তমানের দায়িত্ব এড়ানো যায় না। গণআন্দোলনের পর নির্বাচিত হয়ে আসা সরকারের কাছে মানুষ ছয় মাসে জাদুকরি পরিবর্তন আশা করে না। তারা অন্তত সত্য তথ্য, একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা এবং কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘ লাইনে ত্রুটি খুঁজতে সময় লাগলে আধুনিক ফল্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বসাতে হবে। রক্ষণাবেক্ষণ দল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বিদ্যুতের মতো জরুরি সেবায় মানুষের কাছে অজুহাতের চেয়ে সমাধানই বেশি জরুরি।

তাৎক্ষণিক সংকট সামলানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও এখন থেকে ভাবা দরকার। সেই আলোচনায় ছোট মডুলার পারমাণবিক চুল্লি বা এসএমআর একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। এতে গ্যাস, তেল ও কয়লার আমদানি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমতে পারে। তবে এটি কোনো জাদুর বাক্স নয়। নিরাপত্তা, অর্থায়ন, স্থান নির্বাচন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দক্ষ জনবল ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত না করে এ পথে এগোনো ঠিক হবে না। আগে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে স্বচ্ছ সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে।

সংসদে প্রশ্ন উঠুক, সমালোচনা হোক। কিন্তু তা হোক সঠিক উদ্ধৃতি ও যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে। একইভাবে সরকারও পরিভাষার আড়ালে মানুষের দুর্ভোগ ঢাকবে না। কারণ মানুষ ব্যাখ্যার মারপ্যাঁচ চায় না। তারা চায়, সুইচ চাপলে আলো জ্বলুক।

বিজ্ঞাপন

পারভেজ আবীর চৌধুরী

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD