সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম আনন্দমুখর উৎসব: 'জন্মাষ্টমী'

মহাপুরুষদের বাণীর অপব্যবহার এবং মানুষের ধর্ম পালন থেকে দূরে সরে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গভীর এবং মনস্তাত্ত্বিক। মানুষ মূলত ভন্ডামি ও স্বার্থপরতা দেখে ধর্মের প্রতি আস্থা হারানোর প্রধান কারণগুলো সহজ ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করছি: ১. সহজে অর্থ ও ক্ষমতা অর্জন: সাধারণ মানুষ মহাপুরুষদের বাণী সহজে বিশ্বাস করে।
বিজ্ঞাপন
এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অনেকেই নিজেদের আখের গোছায়। এই পুঁজির জন্য টাকা ও অনুসারী পাওয়া যায়। ২. মানুষের মানসিক দুর্বলতা: মানুষ জীবনে নানা রকম সমস্যায় পড়ে। বিপদ বা দুশ্চিন্তার সময় মানুষ একটু শান্তির খোঁজ করে। ৩. অন্ধ বিশ্বাস ও জ্ঞানের অভাব: অনেক মানুষ ধর্ম বা বাণীগুলোর আসল অর্থ বোঝে না। তাই তারা যাচাই না করেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে। এই সুযোগের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষকে টানে।
৪. বাণীর বিকৃত ব্যাখ্যা ও স্বার্থসিদ্ধি: (ক) ব্যক্তিগত সুবিধা: অনেকে নিজের স্বার্থ বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বাণীর ভুল ব্যাখ্যা করে। (খ) অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া: নিজস্ব কোনো খারাপ কাজ বা কুসংস্কারকে সঠিক প্রমাণ করতে পবিত্র বাণী ব্যবহার করা হয়। (গ) বিভ্রন্তি তৈরি: সাধারণ মানুষ যখন একই বাণীর একাধিক বিপরীতমুখী ব্যাখ্যা দেখে, তখন তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ৫. নৈতিক স্খলন ও ভন্ডামি: (ক) কথায় ও কাজে অমিল: যারা বাণী প্রচার করে, সমাজে প্রায়ই তাদের নিজেদের জীবনে সেই বাণীর প্রতিফলন দেখা যায় না। (খ) আস্থার সংকট: প্রচারকদের এমন ভন্ডামি দেখে সাধারণ মানুষের ধর্মের মূল শিক্ষা ও সততার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়।
৬. বিভাজন বা বিভক্তি সৃষ্টি: মহাপুরুষদের বাণী দিয়ে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে দল-উপদলে ভাগ করা হয়। ৭. কান্তির অভাব: ধর্মের মূল উদ্দেশ্য যেখানে মানসিক শান্তি, সেখানে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখে মানুষ ধর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখে। ৮. বিকল্পের সন্ধান: মহাপুরুষদের পবিত্র বানী নিয়ে শোষণ দেখে অনেকে নৈতিকতা চর্চার জন্য ধর্মহীন বা ধর্মনিরপেক্ষ জীবনধারা বেছে নেয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, মানুষ প্রকৃত ধর্মের প্রতি নয়, বরং ধর্মের নামে চলা কুসংস্কার এবং অপব্যবহারের প্রতি বিরক্ত হয়ে ধর্ম পালন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই যুগে যুগে মহাপুরুষদের আর্বিভাব।
বিজ্ঞাপন
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আছে- পৃথিবীতে অর্ধমের প্রাদুর্ভাবে ভক্ত ও সাধারণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে দুরাচারীর অত্যাচার ও নিপীড়নে, তখন ধর্ম সংস্থাপনের জন্য কৃপা করে ভক্তের আকুল প্রাার্থনায় সাড়া দিয়ে ঈশ্বর ‘অবতার’ রূপ নিয়ে থাকেন। তখন তিনি ষড়গুণ যথা ঐশ্বর্য, বীর্য, তেজ, জ্ঞান, শ্রী ও বৈরাগ্য সম্পন্ন ‘পূর্ণাবতার রূপে’ প্রকাশিত হন।
বেদে বলা আছে, ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়, নিরাকার, জ্যোতির্ময়, সর্বত্র বিরাজমান এবং সর্বশক্তিমান। বেদজ্ঞ জ্ঞানী ঋষিরা নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা করে থাকেন। সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরাকার ঈশ্বরের উপলব্ধি খুবই কঠিন কাজ। ভক্তরা তাঁকে যে নামে ডাকেন, সে নামে তিনি সাড়া দেন। যেভাবে তাঁকে পেতে চান, সেভাবেই তিনি ধরা দেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এবং আনন্দমুখর উৎসব হলো 'জন্মাষ্টমী' বা 'কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী'। দ্বাপর যুগে পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মর্ত্যলোকে যে পুণ্য তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, সেই দিনটিকেই জন্মাষ্টমী হিসেবে উদযাপন করা হয়। পঞ্জিকা অনুসারে, শ্রাবণ মাসের (অমন্ত ঐতিহ্য অনুসারে) কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে, পূণিমন্ত ঐতিহ্য অনুসারে, কৃষ্ণের জন্মোৎসব ভাদ্রপদ মাসের (কৃষ্ণপক্ষের) অষ্টমী তিথিতে উদযাপিত হয়। যা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের সাথে মিলে যায়। কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী (যা কেবল কৃষ্ণাষ্টমী, জন্মাষ্টমী বা গোকুলাষ্টমী নামেও পরিচিত)।
বিজ্ঞাপন
সংস্কৃত শব্দ "জন্মাষ্টমী"-এর অর্থ বোঝায়। এটিকে দুটি অংশে ভাগ করলে "জন্ম" ও "অষ্টমী"। এখানে "জন্ম" অর্থ ভূমিষ্ঠ হওয়া বা জন্মগ্রহণ করা এবং "অষ্টমী" অর্থ আট। সুতরাং কৃষ্ণ জন্মাষ্টমী হলো ভাদ্র মাসের (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম দিনে শ্রীকৃষ্ণের জন্মোৎসব।
এই উৎসবের সাথে যুক্ত বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে উৎসবমুখর উদযাপন, ধর্মীয় গ্রন্থ’ পাঠ ও আবৃত্তি, ভাগবত পুরাণ অনুসারে কৃষ্ণলীলার নৃত্য ও নাট্যরূপ, মধ্যরাত পর্যন্ত ভক্তিমূলক সংগীত পরিবেশনা (যে সময়ে কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল), এবং উপবাস পালন। অনেকে দিনব্যাপী উপবাস শেষে মধ্যরাতে ভোজের মাধ্যমে তা ভঙ্গ করেন। শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, সারা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই দিনটি গভীর ভক্তি, প্রেম ও উল্লাসের সাথে উদযাপিত করে থাকেন। তবে এর উদযাপন ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতি ও প্রথা অনুযায়ী বৈচিত্রময় রূপ ধারণ করে।
শ্রীকৃষ্ণ, দেবকী (মাতা) ও বসুদেব (পিতা)-এর অষ্টম সন্তান। তাঁর জন্মের সময় ভয় ও নির্যাতন ছড়িয়ে পরেছিল, মানুষের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছিল এবং রাজা কংসের জীবনে বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। শ্রীকৃষ্ণের জন্ম ভারতের মথুরার কারাগারের ভেতরে, যেখানে তাঁর পিতা-মাতা কংসের হাতে বন্দি ছিলেন। দেবকীর বিবাহের সময় এক বাণীতে সতর্ক করা হয়েছিল যে দেবকীর অষ্টম সন্তানই হবে কংসের মৃত্যুর কারণ।
বিজ্ঞাপন
এই ভবিষ্যদ্বাণীকে অকার্যকর করার জন্য কংস তাঁর বোন দেবকী ও ভগ্নিপতি বসুদেবকে বন্দি করে রাখে এবং দেবকীর প্রথম ছয়টি সন্তানকেই হত্যা করে। কৃষ্ণ জন্মানোর সময় কারারক্ষীরা ঘুমিয়ে পড়ে এবং অলৌকিকভাবে কারাগারের দরজা খুলে যায়। এ সুযোগে বসুদেব কৃষ্ণকে যমুনা নদী পার করিয়ে তাঁর পালক-মাতা যশোদা ও পালক-পিতা নন্দের কাছে পৌঁছে দেন। গোকুলে যখন সবাই জানতে পারে যে যশোদা একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে, তখন আনন্দের বন্যা রয়ে যায়। এই দিনটিকেই আমরা 'নন্দোৎসব' হিসেবেও পালন করে থাকি।
শ্রীকৃষ্ণের জন্ম মুহূর্তে শিশু কৃষ্ণের প্রতিমাকে স্নান করানো হয়, নতুন বস্ত্র পরানো হয় এবং দোলনায় শায়িত করা হয়। এরপর ভক্তরা উপবাস ভঙ্গ করে পরস্পরের সঙ্গে নানান খাদ্য ও মিষ্টান্ন ভাগাভাগি করে খান। নারীরা ঘরের দরজা ও রান্নাঘরের বাইরে ছোট ছোট পায়ের ছাপ আঁকেন, যা প্রতীকীভাবে শ্রীকৃষ্ণের তাঁদের গৃহে আগমনের ইঙ্গিত বহন করে। শ্রীকৃষ্ণের শৈশব ও যৌবনের পুরো সময় জুড়ে তাঁর ভ্রাতা বলরাম ছিলেন এক "অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী"। বৃন্দাবন, ব্রজ, মথুরা ও দ্বারকা প্রভৃতি স্থানে স্মরণীয় হয়ে ওঠা নানা ঘটনায় কৃষ্ণের সঙ্গে বলরামও অংশ নিয়ে ছিলেন।
কথায় আছে যেমন কর্ম, তেমন ফল। তাই যদি সত্য হয় তাহলে ভালো কর্ম করে যাও, ভালোর ফলের ভাগিদার হও। বিলাসিতার জন্য পাপ করো না। অর্থের নেশায় মত্ত হয়ে অসৎ পথে উপার্জন করার মত আহাম্মকী করোনা। আত্মসুদ্ধির নেশায় মত্ত হয়ে সৎকার্যে নিজেকে উৎস্বর্গ কর, দেখবে জীবন কতইনা সুন্দর। জীবনের কি দীপ্তি। তোমার অপকর্মের জন্য পুরো সমাজ অসুন্দর ও অশান্ত হবে।
বিজ্ঞাপন
শ্রীশ্রীঠাকুর বলেছেন-
“তুমি বিধিকে অবজ্ঞা করিতে পার,
প্রকৃতিকে তাচ্ছিল্য করিতে পার,
বিজ্ঞাপন
সে স্বাধীনতা তোমার আছে।
প্রকৃতিও তার দূর্দান্ত আঘাত হানতে নিবৃত্ত হবে না,
সে স্বাধীনতা প্রকৃতিরও আছে।
বিজ্ঞাপন
কা’জেই বোঝ,
যা’ শ্রেয় বলে মনে বিবেচনা কর, তাই করে চল।”
তাই পাপাচার থেকে দূরে সরে সেবায় ব্রতী হও, তবেই তো হয়ে উঠবে শ্রেষ্ঠ মানব। সভ্যতাকে দান কর। সত্যের ঝুলি থেকে অন্যায় ভাবে অসৎপথে অর্জিত অর্থ নষ্ঠ করা অন্যায়। লোভের বশবর্তী হয়ে জাগতিক কোন প্রাপ্তির পিছনে না ছুটে, সত্যকে সত্য বল, বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে নিজেকে পবিত্র করে তোল, পবিত্র দায়িত্ব পালন কর। হিংসা করোনা। আত্মসংযমী হতে চেষ্টা কর। কাউকে ঠকিও না, তাতে নিজেই ঠকবে। যা আজ হয়তো বুঝতে পারছ না, কিন্তু একদিন তোমার ভবিষ্যৎ বংশধর তার ফল ভোগ করবেই করবে।
বিজ্ঞাপন
শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী আমাদের বোধোদয়ের জন্য। ’শ্রবণ কর, শ্রবণ করাও অন্তরে ধারণ কর, আর বিশ্বসংসারে শুধু বাণীর মাহিমা ছড়িয়ে না দিয়ে তা আগে নিজের অন্তরে ধারন কর। আর নিজেকে চিন, জান এবং শুদ্ধ আত্মা হও।’ শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গের প্রথম কথাই হল, ’আমি চাই শুদ্ধ আত্মা। তখন দেখবে আত্মশুদ্ধির এক মোক্ষম পথে হাঁটার সুযোগ পেয়ে গেছ। সংকীর্ণতা ঝেড়ে ফেলে আর্ত মানবতায় আত্মনিয়োগ কর।’
নটো কিশোর আদিত্য
লেখক : লেখক ও সাংবাদিক।
বিজ্ঞাপন








