১৪টি বোয়িং: বিমান কেনা নয়, বাংলাদেশের আগামীর আকাশ কেনা

বাংলাদেশ বিমান ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে। প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের এই কেনাকাটার খবর প্রকাশের পর থেকেই আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় এত বড় বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়। দাম কত, ঋণের শর্ত কী, উড়োজাহাজগুলো কোন পথে চলবে এবং শেষ পর্যন্ত কতটা আয় করবে, এসব প্রশ্নের উত্তরও থাকা দরকার।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু আলোচনার একটি অংশ ইতিমধ্যে অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। উড়োজাহাজ কেনার প্রয়োজনীয়তা বা ব্যবসায়িক সম্ভাবনার চেয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা সামনে আসছে বেশি। এমনকি সরকারপ্রধানকেও সরাসরি সমালোচনার মধ্যে টানা হচ্ছে। এখানেই একটু থামা দরকার। একটি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে কারও পছন্দ বা অপছন্দের হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য মাপা হবে আকাশে, রাজনীতির মাঠে নয়।
বিমান পরিবহনের বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রয়োজন হওয়ার পর উড়োজাহাজ কিনতে গেলে তখনই তা পাওয়া যায় না। অর্ডার থেকে সরবরাহ পর্যন্ত কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই ভবিষ্যতে কোথায় এবং কীভাবে উড়োজাহাজগুলো ব্যবহার করা হবে, সেই পরিকল্পনা যদি বিমানের হাতে থাকে, তাহলে কয়েক বছর আগে থেকেই ক্রয়প্রক্রিয়া শুরু করা স্বাভাবিক। সমস্যা উড়োজাহাজ আগে কেনায় নয়; সমস্যা হবে, যদি উড়োজাহাজ আগে কেনা হয় কিন্তু তাকে লাভজনক করার পরিকল্পনা পরে খোঁজা শুরু হয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ বহরে যুক্ত হওয়ার কথা। প্রথম উড়োজাহাজ আসবে ২০৩১ সালের শেষ দিকে, বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে ২০৩৫ সালের মধ্যে। অর্থাৎ প্রস্তুতির জন্য এখনো সময় আছে। সেই সময়টিই সবচেয়ে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে।
বিজ্ঞাপন
এমিরেটস বা কাতার এয়ারওয়েজের সাফল্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, শুধু আধুনিক উড়োজাহাজ তাদের আজকের জায়গায় নিয়ে আসেনি। নতুন গন্তব্য, এক দেশ থেকে যাত্রী এনে অন্য দেশে পৌঁছে দেওয়া, যাত্রাবিরতিকে সহজ করা এবং যাত্রীর প্রয়োজন বুঝে সেবা সাজানো, সবকিছু মিলিয়েই তাদের ব্যবসা বড় হয়েছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা আলাদা, কিন্তু শেখার জায়গাটি এখানেই।
বিমানের তাই এখনই আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন ব্যবসায় অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। কোন পথে কোন উড়োজাহাজ লাভজনক হবে, কোন দেশ থেকে ঢাকাকে সংযোগস্থল হিসেবে ব্যবহার করে যাত্রী আনা যাবে, কত সময়ের যাত্রাবিরতি গ্রহণযোগ্য, কোন অঞ্চলের যাত্রীর খাবার ও সেবার পছন্দ কী, কোথায় সপ্তাহে কতটি উড়ান প্রয়োজন, এসবের হিসাব উড়োজাহাজ আসার আগেই করতে হবে।
বিমানের জন্য সুবিধা হলো, সংস্থাটি আগে থেকেই বোয়িং ৭৮৭ ও ৭৩৭ পরিচালনা করছে। ফলে বৈমানিক, প্রকৌশলী, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা নতুন বহরে কাজে লাগবে। কিন্তু সেই সুবিধাকে আয় বাড়ানোর সক্ষমতায় রূপ দেওয়াই হবে বড় পরীক্ষা।
বিজ্ঞাপন
সমালোচনাও এখানে প্রয়োজন। কয়েক বিলিয়ন ডলারের কেনাকাটায় দাম, ঋণের সুদ, পরিশোধের সময়, রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার দায় এবং সম্ভাব্য আয় সম্পর্কে যতটা সম্ভব স্বচ্ছতা থাকতে হবে। সমালোচকদের প্রশ্নের উত্তর তথ্য দিয়েই দেওয়া উচিত। একইভাবে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একটি দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তকে ভালো বা মন্দ বলে দেওয়াও যথেষ্ট নয়।
২০৩১ সাল এখনো দূরে। কিন্তু বিমান পরিবহনের ব্যবসায় পাঁচ বছর খুব দীর্ঘ সময় নয়। নতুন উড়োজাহাজ আসার আগেই নতুন বাজার, যাত্রী, গন্তব্য, সংযোগব্যবস্থা ও সেবার পরিকল্পনা প্রস্তুত করতে হবে। ছোট মনে হওয়া এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত এত বড় বিনিয়োগের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।
১৪টি বোয়িং কেনা ভুল না সঠিক, তার উত্তর আজকের রাজনৈতিক বিতর্কে মিলবে না। উত্তর মিলবে কয়েক বছর পরে বিমানের আয়-ব্যয়ের হিসাবে। এখন সরকারের দায়িত্ব হলো, উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি বাংলাদেশের আগামীর আকাশকে লাভজনক করার প্রস্তুতিও আজ থেকেই শুরু করা।
বিজ্ঞাপন








