অহংকার যেখানে, পতন সেখানে

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র সবসময় মানুষের আত্মিক শুদ্ধি, যাজন এবং চরিত্র উন্নতির কথা বলেছেন। তিনি কেমন সমাজ চেয়েছিলেন, তাঁর বাণী ও আর্দশের দিকে তাকালে তা খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
বিজ্ঞাপন
তিনি এমন এক সমাজ চেয়েছিলেন যা মানুষের অস্তিত্ব রক্ষা, পরম সহিষ্ণুতা, অহিংসা এবং পারস্পরিক ভালোবাসার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। তাঁর আর্দশের মূল কথা ছিল মানুষের ভেতরে শুভ ও সাত্ত্বিক চেতনার জাগরণ ঘটানো, কোনো ধরনের বিদ্বেষ বা বিভেদ সৃষ্টি করা নয়। কিন্তু বর্তমানে অনেকেই তাঁর বাণী বা ভাবাদর্শের ভুল ব্যাখ্যা করে সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর বাণীতে পূর্ববর্তী সমস্ত অবতার, সৎগুরু এবং মহাপুরুষদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন। তিনি মনে করেন, অবতার বা মহাপুরুষগণ যুগে যুগে বিভিন্ন রূপ ধরে পৃথিবীতে আসেন, তাই পূর্বতনদের অস্বীকার করার অর্থ ঈশ্বরীয় বিধানকেই অস্বীকার করা।
শ্রীশ্রীঠাকুর সকল ধর্ম ও মতের প্রবর্তকদের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তিনি ‘অনুশ্রুতি’ প্রন্থে বাণীতে বললেন,
বিজ্ঞাপন
"পূর্ব্বতনে মানে না যারা,জানিস্ নিশ্চয় ম্লেচ্ছ তারা।"
এখানে ম্লেচ্ছ’ শব্দটিকে শ্রীশ্রীঠাকুর কোনো জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে ব্যবহার করেননি, বরং মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যবহার করেছেন। যারা অতীতের পথপ্রদর্শক, মহাপুরুষ বা অবতারদের অস্বীকার করেন, তাদের মধ্যে মূলত চরম অহংকার ও অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ পায়।
শ্রীশ্রীঠাকুর বিশ্বাস করতেন যে ধর্ম বা সত্যের কোনো খন্ডতা নেই। পূর্বতনদের বাদ দিয়ে বর্তমানকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করা যায় না। তাই তাঁর দৃষ্টিতে, পূর্বতন মহাপুরুষ বা অবতারদেও প্রতি শ্রদ্ধা না রাখা হলো এক ধরণের মানসিক ও আত্মিক জড়তা বা অপবিত্রতা, যা মানুষকে আধ্যাত্মিক পথ থেকে বিচ্যুত করে।
বিজ্ঞাপন
শ্রীশ্রীঠাকুর বলতেন, কাউকে বর্জন বা ঘৃণা করে নয়, বরং সবাইকে সাথে নিয়ে চলার মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা। তাঁর মতে, অন্যেও প্রতি পরম সহিষ্ণুতা এবং শ্রদ্ধাবোধই একটি সুস্থ সমাজের ভিত্তি। হিংসা বা সংঘাত নয়, ভালোবাসাই ছিল তাঁর দর্শনের মূল চালিকাশক্তি। তিনি মানুষকে ভালোবাসতে এবং একে অপরের পাশে দাঁড়াতে অনুপ্রাণিত করতেন, যাতে সমাজে শান্তি বজায় থাকে।
শ্রীশ্রীঠাকুর মনে করেন, মুখে বলার চেয়ে নিজের আচরণে আদর্শকে ফুটিয়ে তোলা বেশি জরুরি। তাঁর মূল মন্ত্রই ছিল মানুষের সেবা করা, "বাঁচো ও বাঁচাও"। আপন-পর বা দলাদলির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত ধর্মের কাজ।
বর্তমান সামজে দেখা যায়, সাধারণ মানুষের ধর্মেও মূল শিক্ষা ও সততার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যাচ্ছে? তার কিছু কারণ তুলে ধরছি।
বিজ্ঞাপন
ব্যক্তিগত সুবিধা: অনেকে নিজের স্বার্থ বা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে মহাপুরুষদের বাণীর ভুল ব্যাখ্যা করে থাকেন।
অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া: নিজস্ব কোনো খারাপ কাজ বা কুসংস্কারকে সঠিক প্রমাণ করতে পবিত্র বাণী ব্যবহার করা হয়।
বিভ্রান্তি তৈরি: সাধারণ মানুষ যখন একই বাণীর একাধিক বিপরীতমুখী ব্যাখ্যা দেখেন, তখন তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
বিজ্ঞাপন
কথায় ও কাজে অমিল: যারা বাণী প্রচারক বা প্রচার করেন, সমাজে প্রায়ই তাদের নিজেদের জীবনে সেই বাণীর প্রতিফলন দেখা যায় না।
ধর্মকে ব্যবসার মাধ্যম বানানো: বাণী অপব্যবহার করে অনেকে তার নিজের লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করেন।
আস্থার সংকট: প্রচারকদের এমন ভন্ডামি দেখে সাধারণ মানুষের ধর্মের মূল শিক্ষা ও সততার ওপর থেকে বিশ্বাস হারাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন
বিভক্তি সৃষ্টি: প্রচারকগণ নিজের ভোগের থালা ঠিক রাখার জন্য আর্শীবাদ নামক কিছু শব্দ ব্যবহার করে সমাজে বিভক্তি সৃষ্টি করে রেখেছেন।
শান্তির অভাব: ধর্মের মূল উদ্দেশ্য যেখানে মানসিক শান্তি, সেখানে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা দেখে মানুষ ধর্ম থেকে দূরত্ব বজায় রাখে।
প্রশ্ন তোলার সুযোগ না থাকা: বাণীর দোহাই দিয়ে মানুষের যৌক্তিক প্রশ্নকে চেপে ধরা হয়, প্রতারকরা ক্ষুব্ধ হয়ে অভিশাপ নামক শব্দ উচ্চারণ করেন। তাই অভিশাপ নামক শব্দ শোনা থেকে দুরে থাকেন অনেকেই।
বিজ্ঞাপন
বিকল্পের সন্ধান: ধর্মের নামে শোষণ দেখে অনেকে নৈতিকতা চর্চার জন্য ধর্মহীন বা ধর্মনিরপেক্ষ জীবনধারা বেছে নেন।
স্বার্থ ও অহংকার: কোন প্রচারক নিজের স্বার্থসিদ্ধি জন্য বাণীকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করেন।
বাহ্যিক আচারকে প্রাধান্য দেওয়া: শুদ্ধ আত্মা ও চরিত্রের পরিবর্তনের চেয়ে অনেকে বাহ্যিক লৌকিকতা, আচার-অনুষ্ঠান বা দলবাজিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার জন্য।
বিজ্ঞাপন
মূল গ্রন্থ না পড়া: মহাপুরুষ বা অবতার বা মহানববের মূল বাণী ও গ্রন্থগুলো এবং জীবনী নিজে গভীরভাবে না পড়ে অন্যের মুখে শুনে ভুল তথ্য বিশ্বাস করা।
সঠিক জ্ঞান প্রচার: মহাপুরুষদের বাণীর মূল প্রেক্ষাপটসহ সঠিক ও উদার ব্যাখ্যা মানুষের সামনে তুলে না ধরার প্রবনতা।
আদর্শ আচরণ প্রদর্শন: ধর্মী প্রচারকদের কথা ও কাজের মিল রেখে সততা ও নৈতিকতার বাস্তব উদাহরণ সৃষ্টি করার অক্ষমতা।
বিজ্ঞাপন
সংক্ষেপে বলতে গেলে, মানুষ প্রকৃত ধর্মের প্রতি নয়, বরং ধর্মের নামে চলা ব্যবসা এবং অপব্যবহারের প্রতি বিরক্ত হয়ে ধর্ম পালন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের আদর্শিক চিন্তাধারা এবং প্রকৃত সমাজ ভাবনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক ও তাঁর বাণী নিচে তুলে ধরা হলো:
শ্রীশ্রীঠাকুর কোনো সংকীর্ণ দলবাজি বা অন্য মতের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো সমর্থন করেননি। তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মধ্যে সমন্বয় করতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন: ‘ঈশ্বর এক, ধর্ম, প্রেরিত মহাপুরুষগণ একই বার্তাবাহি।’ ‘ধর্ম তো বহু নয়, ধর্ম একটাই, তা হলো ‘ধৃতি’ বা যা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে ও বাড়িয়ে তোলে।’ তাই শ্রীশ্রীঠাকুর নাম করে যারা অন্য মতাদর্শ বা মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়ায়, তারা প্রকারান্তরে ঠাকুরের মূল অহিংস ও সমন্বয়বাদী দর্শনেরই বিরোধিতা করে। তাঁর কাছে সমাজ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ভালোবাসা। কাউকে আঘাত করে বা দূরে ঠেলে দিয়ে নয়, বরং আপন করে নিয়ে সংশোধনের পথ দেখিয়ে দেওয়া।
বিজ্ঞাপন
ঘৃণা বা সমালোচনা দিয়ে সমাজ সংস্কার সম্ভব নয়, একমাত্র নিখাদ ভালোবাসা ও নিজের ভালো আচরণের মাধ্যমেই এবং যার যতটুকু যা সত্যিকার অর্থে প্রাপ্য তা নিজে জবর দখলে না রেখে তা প্রাপককে বুঝিয়ে দিয়ে নিজে আত্ম শুদ্ধি হওয়ার নামই সৎসঙ্গী। তাতে করে অন্যকেও অনুপ্রণিত করা যায়।
শ্রীশ্রীঠাকুর স্পষ্ট করে বলেছেন, নিজের আচরণে যদি আদর্শ ফুটে না ওঠে, তবে মুখে বড় বড় কথা বলা অর্থহীন। "আগে নিজে আচরণ কর, তবে অন্যকে বল।" যারা নিজেরা ভন্ডামি করে এবং অন্যের প্রতি ঘৃণা ছড়ায়, তারা প্রকৃত সৎসঙ্গী বা ঠাকুরের অনুসারী হতে পারে না। কারণ ঠাকুরের আদর্শ হলো সবাইকে সেবা দেওয়া এবং রক্ষা করা। তাই তো শ্রীশ্রীঠাকুর এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখে ছিলেন যেখানে প্রতিটি মানুষ নিজে বাঁচবে এবং অন্যকে বাঁচতে ও বাড়তে সাহায্য করবে (Live and Let Live)। তাঁর কথায়: "বাঁচতে নরের যা যা লাগে, ধর্ম ব’লে জানিস তারে।" সুতরাং, শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রকৃত অনুসারীদেও প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত সমাজে শান্তি, অহিংসা, সেবা ও পারস্পরিক সহমর্মিতা বজায় রাখা, কোনো প্রকার বিভেদ বা ঘৃণা তৈরি না করা।
শ্রীশ্রীঠাকুর সত্যানুসরণ গ্রন্থে লিখেছেন: "অহংকার যেখানে, পতন সেখানে।" তাই যারা সমাজে কলুষতা ছড়াচ্ছে, তারা নিজেরাই নিজেদের পতন ডেকে আনছে। আমাদের দায়িত্ব হলো নিজের আত্মাকে শুদ্ধ রাখা এবং কুসংস্কার মুক্ত হয়ে তাঁর প্রকৃত ভাবাদর্শকে জীবনে ধারণ করা। আর যখন কোনো মহান আদর্শের ভুল চর্চা হয়, তখন সমাজ কলুষিত হওয়াই স্বাভাবিক। সুতরাং কোনো যাজকের ও মানুষের মনগড়া ব্যাখ্যা না শুনে বিভিন্ন মহাবনবের গ্রন্থসমুহ, তার জীবন নিয়ে লেখা জীবনি এবং তাঁর সাথে কথোপকথন অর্থাৎ আলোচনা প্রসঙ্গে পড়া উচিত।
শ্রীশ্রীঠাকুর
নটো কিশোর আদিত্য
লেখক : লেখক ও সাংবাদিক।








