Logo

সংবাদ কি শুধু অন্ধকারের আয়না?

profile picture
পারভেজ আবীর
১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২১:২৪
সংবাদ কি শুধু অন্ধকারের আয়না?
ফাইল ছবি।

ইদানীং দেশের বিভিন্ন অনলাইন সংবাদপোর্টালের সংবাদ, শিরোনাম ও উপস্থাপনা নিয়মিত লক্ষ্য করছি। এটি কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে লক্ষ্য করে লেখা নয়; বরং সংবাদ নির্বাচনের একটি সামগ্রিক প্রবণতা নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। সেই পর্যবেক্ষণ থেকেই প্রশ্নটি এসেছে, আমাদের সাংবাদিকতা কি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি করে শুধু অন্ধকার, সংঘাত ও ব্যর্থতার খবরকেই সামনে আনছে?

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকতা কোনো সরকারের প্রশস্তি লেখা নয়। অন্যায়কে প্রশ্ন করা, দুর্নীতির মুখোশ খুলে দেওয়া, মানুষের কষ্ট ও অধিকার লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরা সংবাদমাধ্যমের অপরিহার্য দায়িত্ব। এ দায়িত্বে কোনো ছাড় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সাংবাদিকতার কাজ কি শুধু অন্ধকারের ছবি দেখানো? দেশের ভেতরে যা কিছু ভালো, সম্ভাবনাময় ও আশাব্যঞ্জক, তা কি সংবাদ নয়?

সংবাদ একসময় ছিল অপেক্ষার বিষয়। ছোটবেলায় দেখতাম, ভোরের আগে সাইকেলে করে বাড়ির দরজার নিচে খবরের কাগজ রেখে যেতেন হকার। কার বাসায় নিয়মিত পত্রিকা আসে, সেটিও একধরনের রুচি ও সচেতনতার পরিচয় ছিল। সকালে পরিবারের সবাই মিলে সংবাদ পড়ত। খবরের সংখ্যা সীমিত ছিল, তাই বাছাই করা খবরের গুরুত্বও ছিল বেশি।

এখন সংবাদ আমাদের হাতের মুঠোয়। একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা অসংখ্য অনলাইন পোর্টাল, ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়ে। সংবাদপ্রবাহ বেড়েছে, তথ্য পাওয়া সহজ হয়েছে, এটি অবশ্যই বড় অগ্রগতি। কিন্তু এই অতিপ্রবাহের সঙ্গে বেড়েছে দ্রুত ক্লিক পাওয়ার প্রতিযোগিতা। ফলে একই দুর্ঘটনা, একই সংঘাত, একই উত্তেজক বক্তব্য বারবার ভিন্ন শিরোনামে সামনে আসে। এতে সংবাদ যেমন বেশি পৌঁছায়, তেমনি মর্মান্তিক বা উত্তেজক খবরের পুনরাবৃত্তিও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আজকাল অনলাইন সংবাদমাধ্যম খুললেই হত্যা, দুর্ঘটনা, দুর্নীতি, সংঘর্ষ, বাজারের অস্থিরতা ও রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির খবর চোখে পড়ে। এগুলো সংবাদ, এবং মানুষকে তা জানাতেই হবে। কিন্তু প্রতিদিন যদি কেবল হতাশার খবরই সামনে আসে, তাহলে মানুষের মনে একটি ধারণা জন্ম নেয়, এ দেশে বুঝি ভালো কিছু ঘটেই না।

এ দেশে একজন কৃষক নতুন পদ্ধতিতে চাষ করে অন্যদের পথ দেখান। একজন শিক্ষক নিজের উদ্যোগে দরিদ্র শিশুদের পড়ান। একজন তরুণ উদ্যোক্তা কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেন। কোনো চিকিৎসক বা স্বেচ্ছাসেবক নিঃশব্দে মানুষের পাশে দাঁড়ান। দেশের মেধাবী তরুণেরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জন করে। এসব ঘটনা শুধু অনুপ্রেরণার গল্প নয়, এগুলোও দেশের বাস্তবতা। এগুলো জানলে মানুষ বোঝে, সংকটের মধ্যেও সম্ভাবনা আছে।

ইতিবাচক সংবাদ বলতে সরকারের গুণগান বোঝায় না। সমস্যা আড়াল করাও ইতিবাচক সাংবাদিকতা নয়। ইতিবাচক সাংবাদিকতা হলো সমস্যার সঙ্গে সমাধানের পথ খোঁজা। শুধু বলা নয়, কোথায় যানজট বাড়ছে; কোথায়, কী উদ্যোগে তা কমানো সম্ভব হয়েছে, সেটিও জানানো। শুধু বলা নয়, যুবকদের চাকরি নেই; কোন খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, কোন তরুণ নতুন কিছু গড়ছেন, সেটিও তুলে ধরা।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি নেতিবাচক মন্তব্য জনপরিসরে আলোচিত হয়েছে। ভুল করলে বা দায়িত্বে অবহেলা থাকলে অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে, জবাবদিহিও চাইতে হবে। কিন্তু একটি দেশের সব সরকারি কর্মকর্তা একই রকম নন। এই দেশের বহু কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, শিক্ষক ও মাঠপর্যায়ের কর্মী নীরবে রাষ্ট্রের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু, সড়ক, হাসপাতাল, স্কুল কিংবা দুর্যোগের সময় মানুষের কাছে সেবা পৌঁছানোর পেছনে তাঁদের শ্রম ও ত্যাগ আছে।

দুঃখের বিষয়, কোনো অব্যবস্থা বা ব্যর্থতার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু একজন প্রকৌশলীর রাত জেগে প্রকল্প শেষ করা, একজন কর্মকর্তার সৎ সিদ্ধান্তে জনদুর্ভোগ কমা কিংবা কারও নীরব নিষ্ঠার গল্প খুব কমই মানুষের সামনে আসে। ফলে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হয় যে রাষ্ট্রের ভেতরে বুঝি কেবল ব্যর্থতাই আছে। ভালো কাজের স্বীকৃতি যেমন কর্মীদের উৎসাহ দেয়, তেমনি মানুষকেও রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে শেখায়।

সংবাদে ভারসাম্য না থাকলে সমাজের মনেও ভারসাম্য থাকে না। শুধু ভয় দেখালে মানুষ ভীত হয়, শুধু ক্ষোভ দেখালে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, আর শুধু হতাশা দেখালে মানুষ বিশ্বাস হারায়। সংবাদমাধ্যমের প্রভাব এখানেই, তারা শুধু ঘটনা জানায় না, মানুষের ভাবনার দিকটিও প্রভাবিত করে।

বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত আমার অনেক বন্ধু, ভাই ও ছোট ভাই আছেন। তাঁদের পেশার প্রতি আমার গভীর সম্মান রয়েছে। এই লেখা কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমকে ছোট করার জন্য নয়। সংবাদকে আরও ভারসাম্যপূর্ণভাবে দেখার একটি আন্তরিক ভাবনা থেকেই কথাগুলো বলা।

ক্লিকের প্রতিযোগিতায় উত্তেজক শিরোনাম দ্রুত মানুষের নজর কাড়ে। কিন্তু সংবাদমাধ্যম শুধু ক্লিকের জন্য কাজ করে না, সমাজের প্রতিও তার দায়িত্ব আছে। দেশের ভুল, অনিয়ম ও অপরাধ অবশ্যই তুলে ধরতে হবে। আবার যারা নীরবে মানুষের জন্য ভালো কাজ করছেন, তাঁদের কথাও মানুষের কাছে পৌঁছানো দরকার।

কারণ সাংবাদিকতার আয়নায় দেশের ক্ষত যেমন দেখা জরুরি, তেমনি দেশের মুখটিও দেখা দরকার।

বিজ্ঞাপন

পারভেজ আবীর চৌধুরী

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD