এক টুকরো রুটির অভিযোগ, আর আমাদের বিবেকের বিচার

মিরপুর-১-এর একটি দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, এক শিশুকে একজন নিরাপত্তাকর্মী বেল্ট দিয়ে মারছেন। শিশুটি অসহায়ভাবে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করছে। দৃশ্যটি যতটা নির্মম, তার চেয়েও নির্মম হয়ে ওঠে এর পেছনের প্রশ্নটি—একটি শিশুর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচার কি এভাবেই হতে পারে?
বিজ্ঞাপন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, শিশুটি নাকি এক টুকরো রুটি চুরি করেছিল। তবে বিষয়টি নিশ্চিত নয়। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাকর্মীর দাবি, শিশুটি একটি দোকান থেকে মুঠোফোন চুরি করেছিল। ঘটনাটি পুলিশ তদন্ত করছে। ফলে শিশুটি কী নিয়েছিল, আদৌ নিয়েছিল কি না—তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—অভিযোগ সত্য হলেও কোনো শিশুকে মারধর করার অধিকার কারও নেই।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাই এখানে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। কোনো শিশু চুরি করুক, ভুল করুক কিংবা কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ুক—তার বিচার করার দায়িত্ব নিরাপত্তাকর্মী, দোকানদার কিংবা পথচারীর নয়। রাষ্ট্রের আইন আছে, পুলিশ আছে, আদালত আছে। অভিযোগ থাকলে শিশুটিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা যেত। তার বদলে প্রকাশ্যে বেল্ট দিয়ে পেটানো শাস্তি নয়; বরং সেটিই নিজেই একটি গুরুতর অন্যায়।
এর সঙ্গে শিশুটির বয়স ও সামাজিক অবস্থানও আমাদের বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পথশিশুদের জীবন এমনিতেই অনিশ্চয়তায় ভরা। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, আশ্রয়হীনতা ও শিক্ষার সুযোগের অভাব তাদের আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তারা কোনো ভুল করলে আমরা অনেক সময় সেই ভুলের পেছনের বাস্তবতাকে দেখি না; দেখি শুধু অপরাধের অভিযোগ।
বিজ্ঞাপন
একটি ক্ষুধার্ত শিশুর হাতে যদি সত্যিই এক টুকরো রুটি উঠে যায়, সেখানে শুধু ‘চুরি’ শব্দটি বসিয়ে দিলেই পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না। তখন আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে—কেন একটি শিশু খাবারের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত?
অবশ্য দারিদ্র্য কোনো অপরাধকে বৈধতা দেয় না। এটিও সত্য। কিন্তু অপরাধের অভিযোগ এবং শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা এক বিষয় নয়। কেউ অপরাধ করেছে বলে সন্দেহ হলে তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে। সেটিই সভ্য সমাজের নিয়ম। অভিযোগের নামে নির্যাতন চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই ঘটনার আরেকটি দিকও আমাদের ভাবায়। সামান্য অভিযোগে একজন অসহায় শিশুর ওপর মুহূর্তেই কঠোরতা নেমে আসে। অথচ বড় অঙ্কের অর্থের অনিয়ম, প্রতারণা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠলে বিচারপ্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘ হয়। ছোট ও বড় অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া এক নয়—এ কথা ঠিক। কিন্তু ন্যায়বিচারের মূলনীতি সবার ক্ষেত্রেই একই থাকার কথা।
বিজ্ঞাপন
একজন ক্ষুধার্ত শিশুর হাতে থাকা রুটিকে আমরা যদি অপরাধ হিসেবে দেখি, তাহলে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ কিংবা প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ দখলের অভিযোগের ক্ষেত্রেও একই নৈতিক দৃঢ়তা দেখতে চাই। কারণ অপরাধের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আইন ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি ভিন্ন হওয়ার কথা নয়।
মিরপুর-১-এর ঘটনাটি তাই শুধু একজন নিরাপত্তাকর্মীর আচরণের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের সামাজিক মানসিকতারও আয়না। একজন শিশুকে প্রকাশ্যে মারধর করা হচ্ছে—আর আশপাশের মানুষ কী করছিলেন? কেউ কি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন? কেউ কি শিশুটিকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন? নাকি আমরা এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে অন্যের ওপর নির্যাতন দেখেও মোবাইল ফোন বের করে ভিডিও করাই প্রথম প্রতিক্রিয়া?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর মানুষ প্রতিবাদ করেছে—এটি ইতিবাচক। কিন্তু একটি শিশুকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়। তার আগেই প্রয়োজন ছিল একজন মানুষের আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিশুটির পরিচয়, পারিবারিক অবস্থা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবা। তাকে শুধু ‘চোর’ হিসেবে চিহ্নিত করে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। সে যদি সত্যিই কোনো অপরাধ করে থাকে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর যদি অভিযোগ অসত্য হয়, তাহলে তার ওপর চালানো নির্যাতনেরও যথাযথ বিচার প্রয়োজন। দুই ক্ষেত্রেই শিশুর মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।
মিরপুর-১-এর ঘটনাটি আমাদের একটি সহজ কিন্তু কঠিন সত্য মনে করিয়ে দেয়—অপরাধের বিচার করবে আইন, মানুষ নয়। আর শিশুর ভুলের সংশোধন হতে পারে সুরক্ষা, শিক্ষা ও মানবিকতার মাধ্যমে; নির্যাতনের মাধ্যমে নয়।
এক টুকরো রুটি হোক কিংবা একটি মুঠোফোন—অভিযোগের সত্যতা তদন্তের বিষয়। কিন্তু একটি শিশুকে বেল্ট দিয়ে পেটানো যে কোনো সভ্য সমাজের জন্যই লজ্জার। প্রশ্নটি তাই শুধু শিশুটি কী নিয়েছিল, তা নয়; প্রশ্ন হলো—তার কাছ থেকে আমরা কী কেড়ে নিলাম? তার নিরাপত্তা, মর্যাদা ও শৈশবের কতটুকু?
বিজ্ঞাপন
একটি শিশুর ক্ষুধা যদি আমাদের বিবেককে নাড়া না দেয়, অন্তত তার ওপর চালানো নির্যাতন যেন আমাদের থামিয়ে দেয়। কারণ আইনহীনতার সবচেয়ে ভয়ংকর চেহারা তখনই দেখা যায়, যখন দুর্বল মানুষের বিরুদ্ধে শক্তির প্রদর্শনকে আমরা বিচার বলে ভুল করি।
লেখক: আবদুল্লাহ মজুমদার








