স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রভাব, জনগণের পছন্দ কতটা স্বাধীন?

নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। জনগণের ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বৈধতা লাভ করে। তবে সব নির্বাচনের চরিত্র এক নয়।
বিজ্ঞাপন
জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেখানে রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক সরকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া, সেখানে স্থানীয় সরকার নির্বাচন মানুষের দৈনন্দিন জীবন, উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে। এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে তৃণমূল গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি বলা হয়।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে গ্রামগঞ্জে যে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হতো, তার সঙ্গে মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও গভীর সম্পর্ক ছিল। প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যেতেন। ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, সততা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং এলাকার জন্য তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতেন। চায়ের দোকান, বাজার, পাড়া-মহল্লা কিংবা গ্রামের আড্ডায় নির্বাচন হয়ে উঠত অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়।
স্থানীয় নির্বাচনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রার্থী ও ভোটারের সরাসরি সম্পর্ক। একজন ভোটার নিজের এলাকার পরিচিত কাউকে প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ পেতেন। রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে কোনো প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও প্রার্থী পছন্দে ভিন্নতা থাকতে পারত। কিন্তু সেই ভিন্নতা সবসময় সামাজিক সম্পর্ককে সংকটে ফেলত না।
বিজ্ঞাপন
সময়ের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলীয় রাজনীতির প্রভাব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। ২০১৫ সালের পৌরসভা নির্বাচন এবং পরবর্তী সময়ে ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকের বিধান চালুর পর এ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়।
দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নের পক্ষে যুক্তিও রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মতে, এর মাধ্যমে প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট হয়, দলীয় নীতি ও কর্মসূচি ভোটারদের সামনে তুলে ধরা যায় এবং জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। অন্যদিকে সমালোচকদের বক্তব্য, স্থানীয় নির্বাচনকে অতিরিক্ত দলীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে গেলে ব্যক্তির যোগ্যতা ও স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এতে ভোটারের স্বাধীন পছন্দের পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাস্তবে একজন ভোটারের ব্যক্তিগত পছন্দ সবসময় কোনো রাজনৈতিক দলের পছন্দের সঙ্গে মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো ভোটার একটি দলের রাজনৈতিক আদর্শ সমর্থন করতে পারেন, কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে সেই দলের মনোনীত প্রার্থীকে পছন্দ নাও করতে পারেন। আবার কোনো প্রার্থী ব্যক্তিগতভাবে এলাকায় জনপ্রিয় হলেও দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় তাঁর অংশগ্রহণ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এই দ্বন্দ্ব স্থানীয় নির্বাচনের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতাকে অনেক সময় জটিল করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। জাতীয় নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত দল ও প্রার্থীকে কেন্দ্র করে হলেও স্থানীয় নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রায়ই একই এলাকার মানুষ। তারা একই সমাজের সদস্য, প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা দীর্ঘদিনের পরিচিত। ফলে নির্বাচনী বিভাজন যদি ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে প্রবেশ করে, তার প্রভাব শুধু নির্বাচনের দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্পর্কেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এখানে দলীয় রাজনীতির উপস্থিতিকে অস্বাভাবিক বলার সুযোগ নেই। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দল থাকবে, তাদের সমর্থক থাকবে এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিযোগিতাও থাকবে। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কি কোনো পর্যায়ে ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে ছাপিয়ে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন করে। প্রতীকের অনুপস্থিতি ইতিবাচক পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু প্রতীক না থাকলেই যদি দলীয় প্রভাবের অবসান না ঘটে, তাহলে স্থানীয় নির্বাচনের প্রকৃত নির্দলীয় চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।
বিজ্ঞাপন
তাই আলোচনাটি কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন বা বিরোধিতার বিষয় নয়। এটি মূলত স্থানীয় গণতন্ত্রের কাঠামো এবং ভোটারের স্বাধীনতা নিয়ে একটি নীতিগত প্রশ্ন।
স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে হলে প্রথমেই শক্তিশালী করতে হবে জনগণের আস্থা। আর জনগণের আস্থা তখনই বাড়বে, যখন তারা মনে করবেন—তাঁদের ভোট সত্যিকার অর্থেই তাঁদের নিজস্ব পছন্দের প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।
এ কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা এবং এলাকার মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় কারও অযোগ্যতার প্রমাণ নয়, আবার দলীয় পরিচয়ও যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যোগ্য প্রার্থীর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ। কোনো ব্যক্তি যদি স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হন, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন না পাওয়ার কারণে নির্বাচনী প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েন, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে—এটি কি স্থানীয় গণতন্ত্রের জন্য কাঙ্ক্ষিত ব্যবস্থা?
গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো জনগণের অংশগ্রহণ। আর স্থানীয় গণতন্ত্রের শক্তি হলো জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ যত বেশি উন্মুক্ত থাকবে, প্রতিযোগিতা যত বেশি অর্থবহ হবে এবং ভোটারের পছন্দ যত বেশি স্বাধীন থাকবে, স্থানীয় সরকার তত বেশি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।
এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। তারা চাইলে স্থানীয় পর্যায়ে যোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীদের উৎসাহিত করতে পারে। তবে রাজনৈতিক সমর্থন যেন ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তকে প্রতিস্থাপন না করে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রার্থীদেরও নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে ব্যক্তিগত বিরোধে পরিণত না করে নীতি, যোগ্যতা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সামনে আনা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীক থাকুক বা না থাকুক, নির্বাচনে যেন কোনো প্রার্থী অন্যায্য সুবিধা না পান, প্রশাসনিক প্রভাব যেন নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত না করে এবং প্রত্যেক ভোটার যেন ভয়, চাপ ও প্রভাবমুক্তভাবে ভোট দিতে পারেন—এ নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কারণ ভোটের স্বাধীনতা শুধু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ব্যালট দেওয়ার স্বাধীনতা নয়। ভোট দেওয়ার আগে স্বাধীনভাবে প্রার্থী বিবেচনা করা, বিকল্প পছন্দ করা এবং নিজের বিবেক অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও ভোটারের অধিকারের অংশ।
দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের প্রত্যাশায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দলীয় প্রতীক ও মনোনয়নের বিধান পরিবর্তনের উদ্যোগ অনেকের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি করতে পারে। তবে আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনও জরুরি। কারণ শুধু নির্বাচনী আইন বদলালেই দলীয় প্রভাব পুরোপুরি দূর হয় না; প্রয়োজন রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, প্রশাসন ও ভোটার—সবার আচরণে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে যদি সত্যিকার অর্থে জনগণের নির্বাচন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থন একজন প্রার্থীর জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু সেই সমর্থন যেন জনগণের পছন্দের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে না দাঁড়ায়। কারণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মূল জবাবদিহি রাজনৈতিক দলের কাছে নয়, জনগণের কাছে হওয়াই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রত্যাশা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, স্থানীয় সরকার কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের। এসব প্রতিষ্ঠানের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তাই জনগণের মতামত ও স্বাধীন পছন্দকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে আবার উৎসবমুখর করতে হলে শুধু প্রচার-প্রচারণা বাড়ালেই হবে না; জনগণের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে তাদের ভোটের মূল্য আছে, তাদের পছন্দের মূল্য আছে এবং তাদের সিদ্ধান্তই নির্বাচনের মূল ভিত্তি।
গণতন্ত্রে নির্বাচন তখনই অর্থবহ হয়, যখন ভোটার শুধু ভোট দেওয়ার সুযোগ পান না, কাকে ভোট দেবেন—সেই সিদ্ধান্তটিও স্বাধীনভাবে নিতে পারেন।
তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে মূল প্রশ্ন শুধু দলীয় প্রতীক থাকবে কি থাকবে না, তা নয়। আরও বড় প্রশ্ন হলো—স্থানীয় জনগণ কি সত্যিকার অর্থে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পাচ্ছেন?
বিজ্ঞাপন
এই প্রশ্নের উত্তরই অনেকাংশে নির্ধারণ করবে আমাদের স্থানীয় গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, কতটা অংশগ্রহণমূলক এবং কতটা জনগণকেন্দ্রিক।
জনগণ এমন একটি স্থানীয় নির্বাচন প্রত্যাশা করে, যেখানে প্রার্থীর সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে তাঁর যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও জনসম্পৃক্ততা; আর নির্বাচিত হওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে জনগণের আস্থা।
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবের প্রতিযোগিতা না বানিয়ে জনগণের পছন্দের প্রতিযোগিতায় পরিণত করাই হতে পারে তৃণমূল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কার্যকর পথ।
বিজ্ঞাপন
কারণ গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু এই নয় যে জনগণ ভোট দিতে পারে; বরং এর প্রকৃত সৌন্দর্য হলো—জনগণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্তকে সবাই সম্মান করে।
লেখক ও কলামিস্ট
এস এম মিজানুর রহমান মামুন
হোসেনপুর, কিশোরগঞ্জ








