সোনালি আঁশের ম্লান অধ্যায়, বাংলাদেশে পাটশিল্পের হারিয়ে যাওয়া গৌরব

একসময় যে সোনালি আঁশের সুতোয় বোনা হয়েছিল বাংলার অর্থনীতির সমৃদ্ধির স্বপ্ন, আজ সেই আঁশের গৌরব যেন সময়ের ধুলায় ক্রমশ মলিন হয়ে যাচ্ছে। যে পাট একদিন নদীমাতৃক বাংলার মাঠ থেকে সমুদ্রবন্দরের জাহাজ পর্যন্ত অর্থনীতির প্রাণসঞ্চার করেছিল, যে পাটের বাণিজ্যে সমৃদ্ধ হয়েছিল জনপদ, কর্মসংস্থান পেয়েছিল লাখো মানুষ, সেই পাটশিল্প আজ অস্তিত্বের সংকট, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার এক দীর্ঘশ্বাস।
বিজ্ঞাপন
অথচ বিস্ময়ের বিষয়, যে বিশ্ব আজ পরিবেশবান্ধব পণ্যের সন্ধানে ব্যস্ত, সেই বিশ্বের কাছেই বাংলাদেশের পাটের রয়েছে নতুন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার অপার সম্ভাবনা।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে পাটশিল্পের সম্পর্ক কেবল উৎপাদন ও বাণিজ্যের নয়; এটি আমাদের কৃষি, শ্রম, সংস্কৃতি এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। একসময় পাট ছিল বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার পাট বিশ্ববাজারে বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছিল। স্বাধীনতার পরও পাট ও পাটজাত পণ্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাটকে যথার্থই বলা হতো 'সোনালি আঁশ'। কারণ, এই একটি কৃষিপণ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য কলকারখানা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, পরিবহনব্যবস্থা এবং শ্রমনির্ভর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (BJMC) ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর সরকার পরিত্যক্ত ও জাতীয়করণকৃত পাটকলগুলো পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি গঠন করে। সে সময় এর অধীনে ছিল ৭৩টি পাটকল, যেখানে তাঁতের সংখ্যা ছিল ২৩ হাজার ৮৩৬টি। পরবর্তী সময়ে পাটশিল্পের বিস্তার আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৮১ সালের জুনে BJMC-এর অধীনে ৭৪টি পাটকলে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার শ্রমিক এবং ২৭ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। অর্থাৎ, পাটশিল্প যে কেবল রপ্তানি আয়ের উৎস ছিল তা নয়, এটি ছিল বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন।
বিজ্ঞাপন
পাটশিল্পের এই ক্রমাবনতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, সময়ের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটলেও বাংলাদেশের বহু পাটকল পুরোনো যন্ত্রপাতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, পাটের বিকল্প হিসেবে সস্তা প্লাস্টিক ও পলিপ্রোপিলিনের ব্যাপক ব্যবহার পাটজাত পণ্যের বাজার সংকুচিত করেছে। তৃতীয়ত, কাঁচা পাটের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংকঋণের সুদ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস শিল্পটিকে আরও দুর্বল করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নীতিগত দুর্বলতা। ২০১০ সালে সরকার ১৯টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য মোড়কজাত করার ক্ষেত্রে পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক করে আইন প্রণয়ন করলেও এর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে দেশীয় বাজারেও প্লাস্টিকের বস্তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পাট পিছিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক বাংলাদেশের পাটপণ্যের রপ্তানিতে বাড়তি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
পাটশিল্পের সংকটের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে রপ্তানি পরিসংখ্যানেও। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছিল প্রায় ১১৬ কোটি ডলার। পরবর্তী সময়ে এই আয় কমতে কমতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯১.১৫ কোটি ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৫.৫২ কোটি ডলার এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ৮২.০২ কোটি ডলারে নেমে আসে। অর্থাৎ, মাত্র চার বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২৯ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
শুধু রপ্তানি আয় নয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানেও সংকটের ছাপ স্পষ্ট। দ্য ডেইলি স্টার-এর ১৫ ডিসেম্বর ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আওতাধীন ৭৭টি স্পিনিং মিলের মধ্যে মাত্র ২৪টি পূর্ণ সক্ষমতায় চলছিল। অনেক কারখানায় উৎপাদন ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাটের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ কমে ৭৫.৬৫ লাখ বেলে দাঁড়ায়।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর অবস্থাও উদ্বেগজনক। ২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তের পর হাজারো শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ২০২৬ সালের bdnews24.com-এর প্রতিবেদনেও রাষ্ট্রায়ত্ত ৩৫টি পাটকল বন্ধ হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের পাটশিল্প সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি; বেসরকারি খাতে এখনো উৎপাদন ও রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। সংকটটি মূলত শিল্পের সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে।
পাটশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। পুরোনো পাটকলগুলো আধুনিকায়ন করতে হবে এবং যেসব কল পুনরায় চালু করা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব, সেগুলো স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। উন্নতমানের পাটবীজ সরবরাহ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, গবেষণা এবং পাটের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে কৃষি খাতে বিশেষ প্রণোদনা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাটকে শুধু বস্তা ও সুতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। পাট থেকে উন্নতমানের শপিং ব্যাগ, পোশাক, জুতা, কার্পেট, ঘর সাজানোর সামগ্রী, জিওটেক্সটাইল, গাড়ির অভ্যন্তরীণ উপকরণ এবং পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং তৈরি করতে হবে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পরীক্ষাগার, ব্র্যান্ডিং, পণ্য নকশা এবং বিদেশে বাজার সম্প্রসারণে সরকারি সহায়তা বাড়াতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আশার কথা হলো, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত bdnews24.com-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার ২০৩১ সালের মধ্যে পাট খাতের রপ্তানি আয় ১৬৪ কোটি থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করছে। পরিকল্পনায় পাটবীজের দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উচ্চমূল্যের বহুমুখী পাটপণ্যের অংশ ৪৫ শতাংশ থেকে ৭০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও রয়েছে। অর্থাৎ, সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর একটি নীতিগত উদ্যোগ ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছে। এখন প্রয়োজন এর কার্যকর বাস্তবায়ন।
পাটশিল্পের পুনর্জাগরণ কেবল একটি পুরোনো শিল্পকে ফিরিয়ে আনা নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। প্রথমত, পাটকল ও বহুমুখী পাটপণ্যের কারখানা সম্প্রসারিত হলে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন, গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, পাট সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক, পুনর্ব্যবহারযোগ্য ও জীবাণুবিয়োজ্য আঁশ হওয়ায় প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার পরিবেশদূষণ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তৃতীয়ত, বহুমুখী পাটপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশ শুধু কাঁচামাল রপ্তানিকারক নয়, বরং মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনকারী দেশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, পাটশিল্পের ক্রমাবনতি মানে কর্মসংস্থানের সংকোচন, কৃষকের আয় অনিশ্চিত হওয়া, রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানো এবং একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া। পাশাপাশি প্লাস্টিকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ, পাটশিল্পকে অবহেলা করার মূল্য শুধু অর্থনীতিকে নয়, প্রকৃতিকেও দিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের পাটশিল্পের ইতিহাস আমাদের গৌরবের, আর বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আত্মসমালোচনার। যে পাট একদিন বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করত, তাকে আজ নতুন প্রযুক্তি, গবেষণা ও দূরদর্শী নীতির আলোয় পুনরাবিষ্কার করতে হবে। অতীতের সোনালি দিন হুবহু ফিরিয়ে আনা সম্ভব না-ও হতে পারে, কিন্তু সেই অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধি নির্মাণ অসম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, একটি শিল্পের মৃত্যু শুধু কয়েকটি কারখানার দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে নিভে যায় অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন, কৃষকের প্রত্যাশা এবং একটি দেশের সম্ভাবনার প্রদীপ। তাই পাটকে কেবল ইতিহাসের পাতায় সোনালি আঁশ হিসেবে রেখে দিলে চলবে না, তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহে। সোনালি আঁশের গৌরব যেন কেবল স্মৃতির অলংকার হয়ে না থাকে, বরং নতুন বাংলাদেশের সমৃদ্ধির বুননে আবারও হয়ে উঠুক এক উজ্জ্বল সুতো।
তানজিম হোসেন
বিজ্ঞাপন
লোকপ্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়








