Logo

বাংলাদেশে অপ্রতিমের শেষ বিকেল

profile picture
পারভেজ আবীর
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭:৪৭
বাংলাদেশে অপ্রতিমের শেষ বিকেল
ফাইল ছবি।

অপ্রতিম—নামটির অর্থ অনন্য। বাবা-মা নিশ্চয়ই কত আদর আর ভালোবেসে নামটি রেখেছিলেন। তার জন্মের দিন ঘর ভরে উঠেছিল আনন্দে, ভবিষ্যৎ নিয়ে জন্ম নিয়েছিল কত স্বপ্ন। মা হয়তো তাকে বুকে জড়িয়ে ভেবেছিলেন, এই সন্তানই তার পৃথিবী। বাবা হয়তো কল্পনা করেছিলেন, একদিন ছেলেটি বড় হবে, অনেক দূর যাবে।

বিজ্ঞাপন

আজ সেই নামটিই আমাদের ভেতর এক গভীর শূন্যতার প্রতিধ্বনি হয়ে আছে।

যে শিশুকে এত যত্নে পৃথিবীতে আনা হয়েছিল, সে এক বিকেলে আর ঘরে ফিরল না। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাংলাদেশের মাটিতেই থেমে গেল অপ্রতিমের জীবন।

খবরটি পড়ার পর গত রাতে ঘুম আসেনি। বারবার মনে পড়েছে তার বাবা-মায়ের কথা—এই মুহূর্তে তারা কী করছেন? মা কি এখনো ছেলের ঘরের দিকে তাকিয়ে আছেন? বাবা কি অজান্তেই অপেক্ষা করছেন দরজায় শব্দ শোনার?

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সেই দরজা আর খুলবে না।

নিখোঁজের সেই রাতে অপ্রতিমের মা লিখেছিলেন, “আমার ছেলেকে আমি কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে? ও কি বেঁচে আছে?”

এটি কোনো আমাদের সিনেমা/নাটকের সংলাপ নয়। এটি একজন মায়ের বুক ফেটে বেরিয়ে আসা প্রশ্ন। যে মা সকালেও ছেলেকে দেখেছেন, বিকেলে ভেবেছেন সে ফিরে আসবে, সেই মা রাতের অন্ধকারে জানেন না তাঁর সন্তান কোথায়। জঙ্গলে? পানিতে? নাকি কোথাও ভয় পেয়ে মাকে ডাকছে?

বিজ্ঞাপন

একজন মায়ের জন্য এর চেয়ে ভয়ংকর রাত আর কী হতে পারে?

আমারও সন্তান আছে। অপ্রতিমের খবরটি পড়ার পর থেকে নিজের সন্তানের মুখটা বারবার মনে পড়ছে। সন্তান ঘরে ফিরতে একটু দেরি করলেও এখন ভয় লাগে। ফোন ধরতে দেরি করলে বুক ধড়ফড় করে। যাদের একটাই সন্তান, তাদের কাছে সেই একটি শিশুর মধ্যেই তো পুরো পৃথিবীটা গুছানো থাকে। তার হাসিতে সকাল, তার ঘুমে শান্তি, তার ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজার স্বপ্ন।

একসময় আমিও ১৪ থেকে ১৮ বছরের একজন ছেলে ছিলাম। বিকেলে বের হতাম, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাতাম। একটু রাত হলেই মা অস্থির হয়ে যেতেন। কত রাত যে তিনি দরজার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন, কতবার বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় আমাকে খুঁজেছেন, তার হিসাব নেই।

বিজ্ঞাপন

তবু তখন মনে হতো, বাংলাদেশ এতটা অনিরাপদ নয়। মা চিন্তা করতেন, কিন্তু তাঁর সেই চিন্তার ভেতরে ফিরে পাওয়ার একটি বিশ্বাস ছিল। এত বছর পর দেশ আরও নিরাপদ হওয়ার কথা ছিল। রাষ্ট্র আরও শক্তিশালী হওয়ার কথা ছিল। আইন আরও কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। আমাদের সন্তানদের ভয় ও কমার কথা ছিল।

কিন্তু কেন যেন উল্টোটা হলো। আজ সন্তান একটু দেরি করে ফিরলেই বুক কেঁপে ওঠে। ফোন না ধরলেই মনে হয়, কোনো অশুভ খবর আসছে না তো?

অপ্রতিমও তো কোনো বড় কিছু চাইতে বের হয়নি। সে ছবি তুলতে বের হয়েছিল, বন্ধুদের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে চেয়েছিল। একটি শিশুর পৃথিবী খুব ছোট। সে জানে বিকেল হলে মায়ের কাছে ফিরতে হয়। সে জানে না, বাইরে এত ভয় আছে।

বিজ্ঞাপন

আমরা খবরের কাগজে পড়ি, “শিশুর মরদেহ উদ্ধার।” কী সহজ একটি বাক্য! কিন্তু ওই বাক্যের ভেতরে থাকে একটি খালি বিছানা, আধখোলা স্কুলব্যাগ, অসমাপ্ত খাতা, মায়ের অপেক্ষা, বাবার নীরব কান্না। থাকে এমন একটি ঘর, যেখানে সবকিছু আছে, শুধু ঘরের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি নেই।

আমি ব্যবসা করি। ব্যবসায় লাভ-ক্ষতির হিসাব থাকে। কিন্তু একজন বাবা-মা সন্তানের যে ক্ষতি বয়ে বেড়ান, তার কোনো হিসাব হয় না। কোনো টাকা, কোনো সান্ত্বনা, কোনো আশ্বাস, এমনকি ন্যায়বিচারও সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারে না।

তদন্ত হোক, সত্য বেরিয়ে আসুক, যার দায় প্রমাণিত হবে তার বিচার হোক। কিন্তু রাজনীতিবিদদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে। আপনারা বলেন, রাজনীতি মানুষের সেবার জন্য। তাহলে মানুষ এত ভয় নিয়ে বাঁচে কেন? একজন মা সন্তানকে বাইরে পাঠালে কেন আতঙ্কে থাকবেন? থানায় গেলে কেন সাধারণ মানুষ ভাববেন, তাঁর কথা আদৌ শোনা হবে কি না?

বিজ্ঞাপন

জনসেবা করতে আসা মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়া উচিত মানুষের বিশ্বাস, মানুষের দোয়া, মানুষের ভালোবাসা। ক্ষমতার সঙ্গে যদি কারও সম্পদ ও প্রভাব বাড়তেই থাকে, আর সাধারণ মানুষের ভয় বাড়ে, তবে মানুষ প্রশ্ন করবেই।

আমরা বড় কিছু চাই না। আমরা শুধু চাই, অভিযোগ করলে ব্যবস্থা হোক। প্রভাবশালী হলেও কেউ আইনের বাইরে না থাকুক। বাবা-মা যেন সন্তানকে ভয় নিয়ে বড় না করেন।

উন্নয়ন শুধু সেতু, রাস্তা আর বড় বড় ভবন নয়। উন্নয়ন হলো একটি মা বিকেলে সন্তানকে বলে, “সন্ধ্যার আগে চলে এসো বাবা,” আর সন্ধ্যা হলে সে সত্যিই ফিরে আসে।

বিজ্ঞাপন

অপ্রতিম আর ফিরবে না। কিন্তু তার চলে যাওয়া যেন আমাদের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়।

দেশকে ভালোবাসি বলেই বলছি, আমাদের নিরাপদে বাঁচতে দিন।

পারভেজ আবীর চৌধুরী

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি

বিজ্ঞাপন

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD