Logo

❝ফুটপাতের ফুল: কে নেবে দায়?❞

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৫
❝ফুটপাতের ফুল: কে নেবে দায়?❞
ছবি: সংগৃহীত

শহরের আলো যখন রাতে সবচেয়ে জ্বলে ওঠে, তখন ফুটপাতের এক কোণে কুঁকড়ে থাকে একটি ছোট্ট শরীর। গায়ে ছেঁড়া জামা, পেটে ক্ষুধার জ্বালা, চোখে ঘুমের বদলে শুধু সতর্কতা। অন্য শিশুরা যখন মায়ের কোলে রূপকথা শুনে চোখ বন্ধ করে, সে তখন শিখে ফেলে কীভাবে রাতের অন্ধকারে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে হয়। তার নামের পাশে কোনো ঠিকানা নেই। জন্মদিনের কেক নেই। “সাবধানে যেও” বলে বিদায় জানানোর কেউ নেই।

বিজ্ঞাপন

আমরা প্রতিদিন তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই। সিগন্যালে গাড়ির কাঁচে তাদের হাত দেখে চোখ ফিরিয়ে নিই। আর প্রশ্নটা থেকেই যায়—যাদের কোনো অভিভাবক নেই, তাদের অভিভাবক হবে কে?

বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে লাখ লাখ শিশু রাস্তাকেই ঘর বানিয়েছে। কেউ দারিদ্র্যের চাপে, কেউ নদীভাঙনে সব হারিয়ে, কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুতে, কেউ আবার নির্যাতনের ভয়ে ঘর ছেড়েছে। ঢাকার রেলস্টেশন, চট্টগ্রামের বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাতের ধুলো—এসব জায়গাই এখন তাদের ঠিকানা। এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি করে মুখ, একটি করে অসমাপ্ত শৈশব।

রাস্তা তাদের কাছে একসঙ্গে ঘর, স্কুল আর কর্মক্ষেত্র। অথচ সে ঘরের কোনো দরজা নেই, কোনো চাবি নেই। রাত নামলে ঘুমন্ত শিশুরা হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহজ শিকার। চুরি, মারধর, যৌন নির্যাতন—বিশেষ করে মেয়েশিশুদের জন্য বিপদ আরও গভীর। কেউ ফুল বিক্রি করে, কেউ কাগজ কুড়ায়, কেউ ভিক্ষা করে, আবার কেউ অপরাধচক্রের হাতের পুতুল হয়ে মাদক বহন করে।

বিজ্ঞাপন

খোলা আকাশের নিচে অপরিষ্কার পানি আর অপুষ্টিতে তারা অসুখে ভোগে। চিকিৎসার সুযোগ নেই বললেই চলে। ক্ষুধা ভুলতে অনেকে নেশার দিকেও ঝুঁকে পড়ে। স্কুলের দরজা তাদের জন্য বন্ধ। জন্মনিবন্ধন নেই বলে ভর্তি হওয়ার সুযোগও নেই। ফলে অজ্ঞতা আর দারিদ্র্যের চক্র এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে গড়িয়ে চলে।

শারীরিক ক্ষতের চেয়েও গভীর হয় মনের ক্ষত। অবহেলা, ঘৃণা আর সহিংসতার মধ্যে বড় হতে হতে তাদের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস। ক্ষোভ। অসহায়ত্ব। সমাজ তাদের “টোকাই” বলে ডাকে। অথচ এই শিশুরাই আমাদের ব্যর্থতার সবচেয়ে নীরব সাক্ষী।

আইনের খাতায় দায়িত্ব লেখা আছে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে বাংলাদেশ স্বাক্ষর করেছে। আমাদের শিশু আইনেও প্রতিটি শিশুর সুরক্ষা আর বিকাশের কথা বলা আছে। কিন্তু কাগজের অঙ্গীকার আর রাস্তার বাস্তবতার মধ্যে ফারাক যেন নদীর দুই পাড়ের মতো। সরকারি সংস্থা, বেসরকারি সংগঠন, স্থানীয় প্রশাসন—সবাই কিছু না কিছু করছে। কিন্তু সমন্বয়ের অভাবে অনেক উদ্যোগ শিশুর কাছে পৌঁছয় না। দায় তাই এককভাবে কারো নয়। আবার সম্মিলিতভাবে সবার।

বিজ্ঞাপন

এই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরানোর পথ আছে। রাষ্ট্রকে শহরে শহরে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র গড়তে হবে। বিনা মূল্যে শিক্ষা, চিকিৎসা আর জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে।

শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থায় তদারকি আর জবাবদিহি বাড়াতে হবে। পুলিশকে পথশিশুদের সঙ্গে আচরণে সংবেদনশীল হতে হবে। আর যারা তাদের শোষণ করে, তাদের আনতে হবে আইনের আওতায়। বেসরকারি সংস্থা আর ব্যবসায়ী সমাজ দক্ষতা প্রশিক্ষণ, বিকল্প শিক্ষা আর পুনর্বাসনে এগিয়ে আসতে পারে। গণমাধ্যম পথশিশুদের গল্প তুলে ধরবে করুণা জাগানোর জন্য নয়—দায়বোধ জাগানোর জন্য।

আর আমরা প্রত্যেকে কাউকে “টোকাই” বলে অবজ্ঞা না করে সম্মানের সঙ্গে আচরণ করতে পারি। কোনো শিশুকে বিপদে দেখলে সাহায্য করতে পারি। অথবা শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এ জানাতে পারি। এই ছোট ছোট পদক্ষেপই বদলে দিতে পারে একটি জীবন।

বিজ্ঞাপন

শিশুরা এ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুল—কবিরা যুগে যুগে এ কথাই বলে এসেছেন। কিন্তু সব ফুল তো আর বাগানে ফোটে না। কেউ কেউ ফোটে ফুটপাতের ধুলোয়। অবহেলার রোদে পুড়ে। বিনা যত্নে। একটি সমাজকে চেনা যায় তার সবচেয়ে অসহায় সন্তানদের সঙ্গে সে কেমন আচরণ করে, তা দিয়ে। আমরা যতই আকাশছোঁয়া ভবন গড়ি, যতই উন্নয়নের ফিরিস্তি দিই—যদি একটি শিশুও রাতে অনাহারে, অনিরাপদে ঘুমাতে যায়, তবে সে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ।

তাই আসুন, দায় চাপানোর খেলা থামিয়ে হাত বাড়াই। কারণ প্রতিটি পথশিশুর চোখে যে প্রশ্নটি জমে আছে, তার উত্তর আমাদেরই দিতে হবে—

“আমারও কি একটা ঘর হতে পারে না?”

বিজ্ঞাপন

সাদিয়া ইসলাম কাসফিয়া

শিক্ষার্থী, বাংলা সাহিত্য

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD