Logo

মাছের ছদ্মবেশী বেইজিংয়ের গুপ্তচর

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০০
মাছের ছদ্মবেশী বেইজিংয়ের গুপ্তচর
ছবি: সংগৃহীত

দেখতে পুরোপুরি একটা মাছ। সোনালি আঁশ, দুলতে থাকা লেজ, পানিতে ভেসে বেড়ানোর ভঙ্গিতে অ্যাকুরিয়ামের শখের মাছের সঙ্গে কোনো তফাত নেই। কিন্তু একে যদি অ্যাকুরিয়ামের বদলে সত্যিকারের সমুদ্রে ছেড়ে দেওয়া হয়, সেই গভীর জলে, যেখানে সাবমেরিন নিঃশব্দে চলে আর সোনারের পর্দায় সবাই নিঃশ্বাস আটকে বসে থাকে, তখন এই ‘মাছ’ আর মাছ থাকে না। সে হয়ে ওঠে একজোড়া চোখ, যে চোখকে কেউ চিনতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

১. যে মাছ আসলে মাছ নয়: ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের সার্ভিস ট্রেড ফেয়ারে প্রদর্শিত হয় একটি রোবটিক মাছ। নাম বিজি-৫, ডাকনাম ‘গোল্ডেন ড্রাগন ফিশ’। কাচের জলাধারে ছাড়ার পর দর্শনার্থীদের প্রায় সবার মনে একই প্রশ্ন জাগে: এটা কি সত্যিকারের মাছ? পরে এক কর্মী যখন সেটিকে তুলে আনেন, প্লাস্টিকের আঁশ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। তখনই সবাই বোঝেন, কয়েক মিনিট ধরে মুগ্ধ হয়ে যাকে দেখছিলেন, সেটি আসলে একটা যন্ত্র। তবে এই মাছের আসল রহস্য সে মাছের মতো দেখতে, তা নয়। আসল রহস্য হলো, তাকে মাছের মতো হতেই হলো কেন।

২. প্রপেলারের শব্দই যখন সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতক: প্রচলিত আন্ডারওয়াটার ড্রোন চলেপ্রপেলারে। প্রপেলার ঘোরার সময় পানিতে বুদবুদ তৈরি হয়, আর সেই বুদবুদের একটানা শব্দ বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষ সোনার অপারেটর সেই শব্দের ধরন শুনেই বুঝে ফেলেন, ওটা মানুষের বানানো যন্ত্র। ফলে বেশিরভাগ ড্রোনের উপস্থিতি লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই ফাঁস হয়ে যায়। রোবটিক মাছ নিয়েছে ভিন্ন পথ। তার কোনো প্রপেলার নেই। শরীর সাতটি অংশে বিভক্ত, লেজে আছে তিনটি ঘূর্ণনযোগ্য জোড়। সত্যিকারের মাছের মতো শরীর আর লেজ দুলিয়ে সে পানি পেছনে ঠেলে এগিয়ে যায়। এতে শব্দ হয় অত্যন্ত কম, আর তার চলার ভঙ্গিও স্বাভাবিক। তাই সোনারে কোনো সংকেত ধরা পড়লেও অপারেটরের প্রথম ধারণা হতে পারে ‘মাছের ঝাঁক’, ‘ড্রোন’ নয়। এটাই বায়োমিমিক্রির মূল দর্শন। আরও ভালো যন্ত্র বানানো নয়, বরং এমন যন্ত্র বানানো, যেখানে যন্ত্র বলে চেনার উপায়টাই হারিয়ে যায়।

৩. মাছের মতো, কিন্তু মাছ নয়: বিজি-৫-এর মাপজোখ চমকপ্রদ নয়। দৈর্ঘ্য ৬৪০ মিলিমিটার, প্রস্থ ২০৪, উচ্চতা ৯০। ওজন প্রায় তিন কেজি, সর্বোচ্চ ডুব পাঁচ মিটার, সর্বোচ্চ গতি সেকেন্ডে ০.৬ মিটার, অর্থাৎ ঘণ্টায় প্রায় ২.২ কিলোমিটার। সামরিক সরঞ্জামের মানদণ্ডে এ যেন খেলনা। কিন্তু এ ধরনের যন্ত্রের আসল শক্তি তার ভেতরের সিস্টেমে। বিজি-৫-এ আছে ইনফ্রারেড শনাক্তকরণ মডিউল ও সেন্সর অ্যারে। ফলে আগে থেকে নির্দিষ্ট রুট ঠিক করে না দিলেও সে নিজে বাধা চিনে পথ বদলাতে পারে। অচেনা পানিতে ছাড়লে কেউ বলে দেওয়ার দরকার নেই, ‘বাঁয়ে পাথর, ডানে ঘাস’। সে নিজেই দেখে, নিজেই ঘোরে। একবার চার্জে কাজ করতে পারে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা। আরও গুরুত্বপূর্ণ এর উন্নত সংস্করণ বিজি-৫ভি। এতে যুক্ত হয়েছে পথ পরিকল্পনা, কাজ ভাগ করে নেওয়া এবং একাধিক রোবটের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা। সহজ কথায়, একসঙ্গে অনেক রোবটিক মাছ নামানো যাবে। প্রতিটি দেখবে নির্দিষ্ট এলাকা, নিজেদের মধ্যে তথ্য বিনিময় করবে, আর শনাক্ত করা তথ্য পাঠাবে কমান্ড সেন্টারে। আলাদা করে প্রতিটিকে দূর থেকে চালাতে হবে না। একটি রোবটিক মাছ মানে একজন স্কাউট। একদল মাছ মানে একটা জাল।

বিজ্ঞাপন

৪. বন্দরের নিচে নজরদারি: বড় আন্ডারওয়াটার ড্রোনের একটা অস্বস্তিকর সীমাবদ্ধতা আছে। তারা গভীর সমুদ্রে দক্ষ, কিন্তু অগভীর পানিতে নয়। বন্দর, উপকূল, নদীর মোহনা, প্রবাল-পাথরে ভরা এলাকায় পানি কম, ভূপ্রকৃতি জটিল, জায়গা সংকীর্ণ। বড় যন্ত্র সেখানে ঢুকতে পারে না, ঢুকলেও আটকে যায় বা ধরা পড়ে। অথচ সামরিক দিক থেকে এই এলাকাগুলোই সবচেয়ে সংবেদনশীল। বন্দর মানে জাহাজের আশ্রয়, উপকূল মানে অবতরণের পথ, অগভীর পানি মানে ডুবুরি অনুপ্রবেশের করিডর। বিজি-৫-এর আকার আর চলন ঠিক এই জায়গাগুলোর জন্যই মানানসই। সে পাঁচ মিটারের কম গভীরতায় চলতে পারে, পাথর আর জলজ উদ্ভিদের ফাঁক গলে এগোতে পারে, আর আকারে এত ছোট যে সাধারণ নজরদারি ব্যবস্থা তাকে হুমকি বলে ভাবে না। ঝাঁক বেঁধে নামালে কয়েক ডজন মাছ একসঙ্গে কাজ করে, নজরদারির আওতা বহুগুণ বাড়ে, আর আলাদাভাবে প্রতিটির ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে খুবই কম। বিজি-৫-এর নির্মাতা বোয়াগংদাও কোম্পানি। এর পটভূমি নিছক বেসামরিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নয়। প্রতিষ্ঠানটি আগে চীনা সামরিক বাহিনীর একটি সংস্থার সঙ্গে মিলে ‘রোবো-শার্ক’ নামে বায়োমিমেটিক হাঙর তৈরি করেছিল, আর কোম্পানিটিকে সামরিক-বেসামরিক সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। প্রদর্শনীতে বিজি-৫-কে দেখানো হয়েছে ‘আন্ডারওয়াটার পেট্রোলিং ও ডিটেকশন’ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে। কিন্তু একই প্রযুক্তি কোন পথে এগোতে পারে, তা বুঝতে বেশি কল্পনার দরকার হয় না। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে কোম্পানির এক প্রতিনিধি নিজেও স্বীকার করেছেন, তাদের বায়োমিমেটিক প্রযুক্তি সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতেও ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. বদলে যাচ্ছে ‘ধরা পড়া’র সংজ্ঞা: পানির নিচের যুদ্ধে প্রশ্ন সবসময় একটাই: কে আগে কাকে দেখতে পায়। সাবমেরিন ভয়ংকর, কারণ শব্দ শোনার আগেই সে আঘাত হানতে পারে। সাবমেরিনবিরোধী অভিযান কঠিন, কারণ সমুদ্র বিশাল আর শব্দ ক্ষীণ। এখন যদি পানির নিচে একদল ‘মাছের মতো’ জিনিস নিঃশব্দে ঘুরে বেড়ায়, তখন শনাক্তকারীর প্রশ্নটা আর ‘লক্ষ্য চেনা’ থাকে না। প্রশ্ন দাঁড়ায়, সমুদ্রের ভেতর থেকে এমন একটা জিনিস ছেঁকে বের করা, যে নিজেকে সমুদ্রেরই অংশ বানিয়ে রেখেছে। সাবমেরিন চেনা তবু সহজ, কারণ সেটা ধাতুর তৈরি, আর তার শব্দের নিজস্ব স্বাক্ষর আছে। কিন্তু বায়োমিমেটিক মাছের খোলস, লেজ দোলানোর কম্পাঙ্ক, চলার ধরন, সবই গড়া হয়েছে চারপাশের প্রাণিজগতের অনুকরণে। অবশ্য বাড়িয়ে দেখারও কারণ নেই। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী বিজি-৫ কাজ করে মাত্র পাঁচ মিটার গভীরতায়। গভীর সমুদ্রে সাবমেরিনবিরোধী অভিযান বা পারমাণবিক সাবমেরিনের পিছু নেওয়া তার কাজ নয়। কিন্তু বন্দর প্রতিরক্ষা, উপকূলীয় নজরদারি, উভচর অবতরণের আগাম সতর্কতা, এই ‘শেষ এক মাইলের’ সমস্যায় তিন কেজির একটি রোবটিক মাছ তিন হাজার টনের ফ্রিগেটের চেয়েও কাজের হতে পারে। কারণ সে এমন কাজ পারে, যা ফ্রিগেটের সাধ্যের বাইরে: পানির ভেতরে হারিয়ে গিয়ে একটা মাছ হয়ে যাওয়া। বেইজিংয়ের প্রদর্শনীতে সোনালি মাছটি তখনো জলাধারে চক্কর দিচ্ছে। দর্শনার্থীরা মোবাইলে ভিডিও করছেন, হাসতে হাসতে বলছেন, ‘একদম আসল!’ তাঁরা ঠিকই বলছেন। এটা সত্যিই আসল, বরং অনেক বেশি আসল। আর এই ‘অনেক বেশি আসল’ হওয়াটাই এই প্রযুক্তির সব মূল্যের শুরু। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের পানির নিচের প্রতিযোগিতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়েরও শুরু।

লেখক: সাব্বির রহমান,

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,

ঢাকা কলেজ।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD