Logo

ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সতর্কতা জরুরি

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
১ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৭
ভূমিকম্প ঝুঁকিতে বাংলাদেশ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে সতর্কতা জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ভূখণ্ড ভৌগোলিকভাবে এমন এক টেকটোনিক সংযোগস্থলে অবস্থিত, যেখানে ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বার্মা প্লেটের সংঘর্ষ চলছে অবিরাম। ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, চট্টগ্রাম-ত্রিপুরার একটি ভাঁজ পর্বতশ্রেণি ও সংশ্লিষ্ট ফল্ট লাইন-এই সক্রিয় ভূ-গঠনগুলো আমাদের দেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির মূল উৎস।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চল। তাছাড়া, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করছেন অপরিকল্পিত নগরায়ন, অবকাঠামো ও ঘনবসতির বিষয়ে। কিন্তু একটি বিষয় আলোচনার আড়ালে পড়ে যায়, তা হলো ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত উত্তোলন এবং ভূমিকম্পের মধ্যে সম্ভাব্য সম্পর্ক।

পানি উত্তোলন ভূমিকম্পের মূল কারণ নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ভূমিকম্পকে ত্বরান্বিত করতে পারে। মাটির নিচের শিলাস্তর ও পানি একসঙ্গে ভূভাগের ভার বহন করে। অতিরিক্ত পানি তুলে নিলে শিলার ছিদ্রে পানির চাপ কমে যায়, ফলে ওপরের ভূখণ্ডের ভার শিলাস্তরের ওপর বেশি পড়ে। এতে মাটি দেবে যায় এবং আশপাশের ফাটলগুলোর ওপর চাপের ভারসাম্য বদলে যায়। যেসব ফাটলে আগে থেকেই টেকটনিক চাপ জমে আছে, সেখানে এই পরিবর্তন সামান্য ধাক্কার মতো কাজ করে এবং চাপ হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভূমিকম্প ঘটতে পারে।

বিবিসি এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেনের শহর লোরকায় ২০১১ সালে ভয়াবহ একটি ভূমিকম্প হয়। লোরকার ভূগর্ভের ফল্ট পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভূগর্ভস্থের পানি উত্তোলনই ওই ভূমিকম্পকে তরান্বিত করতে পারে। উপগ্রহের মাধ্যমে ওই অঞ্চলের ভূগঠন পরীক্ষা করে ভূতলের কোন অংশ কোন দিকে সরে গেছে, বিজ্ঞানীরা তা নির্ধারণ করেছেন। তারা বলছেন, যেসব স্থান থেকে কয়েক বছর ধরে পানি উত্তোলন করা হয়েছে, সেসব স্থানের সঙ্গে ওই স্থানচ্যুতির যোগসূত্র রয়েছে। পানি উত্তোলনের ফলে ভূতলের স্থানচ্যুতি ঘটে। ভূপৃষ্ঠের মাত্র ৩ কিলোমিটার গভীরে এ ধরনের চ্যুতি ঘটে। ফলে মাত্র ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পেই উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয় শহরটিতে।

বিজ্ঞাপন

১৯২০ -এর দশক থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার সান ওয়াকিন ভ্যালি অনিয়মিতভাবে দেবে যাচ্ছে এবং অনুমান করা হয় এটি প্রায় ২৮ ফুট পর্যন্ত দেবে গেছে । খরার সময়ে ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের কারণে উপত্যকাটি দ্রুত দেবে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই প্রসঙ্গটি আরও জরুরি হয়ে ওঠে। কেননা, দেশের কৃষি, শহুরে পানির চাহিদা এবং শিল্প—সব ক্ষেত্রেই ভূগর্ভস্থ পানির ওপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছর গড়ে ২ মিটার বা প্রায় ৭ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী-জলাশয় দখল, সবুজ বনের সংকোচন, গাছ উপড়ে ফেলা এবং বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশের সুযোগ কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে পানি সরবরাহের সংকটের পাশাপাশি ভূমির স্থিতিশীলতা ও নগরের দুর্যোগ ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বরেন্দ্র অঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির স্তর উদ্বেগজনকভাবে নেমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সেচের জন্য গভীর নলকূপের ব্যবহার, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং জলাধার ও খালের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনই বাংলাদেশের ভূমিকম্পের একমাত্র কারণ- এমন দাবি করা যায় না। টেকটোনিক প্লেটের চলাচলই মূল নিয়ামক। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, মানুষের কার্যকলাপ কখনও কখনও প্রকৃতির সময়সূচি ও নিয়ম ত্বরান্বিত ও পরিবর্তন করতে পারে। ভূমিকম্প তৈরি করা যায় না, কিন্তু ফল্ট লাইনে চাপের ভারসাম্য বদলে দেওয়া যায়। যে ফল্ট হয়তো আরও কয়েকশ বছর পরে সক্রিয় হতো, মানুষের কার্যকলাপে তা আগেও ঘটতে পারে। বাংলাদেশের ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে এই সময় এগিয়ে আসা মানে বিপুল প্রাণহানি ও সম্পদহানি। কারণ আমাদের নেই পর্যাপ্ত প্রতিকার, প্রতিরোধ ব্যবস্থা।

তাই পানি মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কোন এলাকায় পানির স্তর সবচেয়ে বেশি কমছে এবং সেই এলাকার নিচে কী ধরনের ফল্ট আছে—এই ধরণের তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-পৃষ্ঠের পানি, বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং পানি পুনর্ব্যবহারের দিকে জোর দিতে হবে। এটি শুধু ভূমিকম্প ঝুঁকির জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানির নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য। এছাড়াও, পানির স্তর হ্রাসের ভূ-যান্ত্রিক প্রভাব, অর্থাৎ ভূ-পৃষ্ঠের নিচের শিলাস্তরের ওপর চাপের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা দরকার। এজন্য ভূমিকম্পবিদ্যা এবং হাইড্রোজিওলজির মধ্যে এই আন্তঃবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। তবে ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাই ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের প্রভাব নিয়ে গবেষণা শুরু করা, তথ্য সংগ্রহ করা এবং নীতি নির্ধারণে তা ব্যবহার করার মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব। তাছাড়া, বাংলাদেশের ভূ-গর্ভস্থ পানির প্রতিটি ফোঁটা আমাদের কৃষি ও শহরের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য। আমাদের সময় এখনই, মাটির নিচে পানি ভারসাম্য রক্ষার্থে জোরদার পদক্ষেপ গ্রহণ করার।

বিজ্ঞাপন

লাবনী আক্তার শিমলা

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD