এখনও বই হাতে পায়নি লাখো শিক্ষার্থী, চলছে ছাপার কাজ

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হয়েছে প্রায় এক মাস আগে। বছরের প্রথম দিনে বই উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ার যে চিরচেনা দৃশ্য, তা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে এ বছর। কারণ এখনো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৩০ লাখের বেশি পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায়নি।
বিজ্ঞাপন
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ১৫ জানুয়ারির মধ্যে শতভাগ বই বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তবে ২৫ জানুয়ারি পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। যদিও প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে বই বিতরণ শেষ হয়েছে, মাধ্যমিক পর্যায়ে বিশেষ করে ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এনসিটিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এ বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে ১০৫টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ কোটিরও বেশি বই ছাপার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রায় ২৯ কোটি ৯১ লাখ কপি বই মুদ্রণ সম্পন্ন হয়েছে, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ৯৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
তবে মাঠপর্যায়ে বই পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে সরবরাহ ব্যবস্থা। উপজেলা পর্যায়ে এখন পর্যন্ত পৌঁছেছে প্রায় ২৯ কোটি ৭১ লাখ কপি বই। ফলে প্রায় ৩০ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি বই বিতরণ বাকি আছে। কাগজে-কলমে শতভাগের কাছাকাছি অগ্রগতি থাকলেও বাস্তবে বহু শিক্ষার্থী এখনো বই হাতে পায়নি।
ইতিবাচক দিক হলো—প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক (সাধারণ) স্তরে বই বিতরণ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৮ কোটির বেশি বই এবং প্রাথমিক স্তরে ৩১ কোটির বেশি বই। এই দুই স্তরে মুদ্রণ, মান যাচাই ও সরবরাহ—সব ধাপ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।
সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছে মাধ্যমিক স্তর। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির জন্য নির্ধারিত ছিল প্রায় ১৮ কোটির বেশি বই। মুদ্রণ প্রায় শেষ হলেও বিতরণ হার কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯৮ শতাংশে।
বিজ্ঞাপন
শ্রেণিভিত্তিক চিত্রে দেখা যায়— ষষ্ঠ শ্রেণি: প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কপি বাকি, সপ্তম শ্রেণি: সবচেয়ে বেশি ঘাটতি, ১০ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি কপি, অষ্টম শ্রেণি: প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার কপি বাকি এবং নবম শ্রেণি: প্রায় ২ লাখ ৫৮ হাজার কপি এখনো বিতরণ হয়নি। এর মধ্যে সপ্তম শ্রেণিতেই সংকট সবচেয়ে প্রকট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার বই ছাপার কাজ রিটেন্ডারের মধ্যে পড়ায় পুরো প্রক্রিয়ায় সময়ক্ষেপণ হয়েছে। দরপত্র বাতিল, পুনরায় আহ্বান, প্রেস নির্বাচন, কাগজ সংগ্রহ ও ছাপার সূচি নির্ধারণ—সব মিলিয়ে কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।
এছাড়া কিছু প্রেসকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ও অনিয়মের তথ্য সামনে আসায় ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বই ছাপার ৬০৩ কোটি টাকার দরপত্র বাতিল করা হয়। ফলে নতুন করে কার্যাদেশ দিতে দেরি হওয়ায় অনেক মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়মতো কাজ শুরু করতে পারেনি। এতে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাতেও চাপ তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় ‘শর্ট বই’ একটি স্বাভাবিক বিষয়। ছাপার সময় কাগজ নষ্ট হওয়া, কাটিং বা মুদ্রণ ত্রুটির কারণে কিছু কপি কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ১০–২০ হাজার পর্যন্ত ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
তাদের দাবি, অধিকাংশ বই ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে গেছে এবং অবশিষ্ট প্রায় এক শতাংশ বই চলতি মাসের মধ্যেই বিতরণ সম্পন্ন করা হবে।
বিজ্ঞাপন
বোর্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা মনে করছেন, সময়মতো বই পৌঁছে দিতে হলে টেন্ডার ও মুদ্রণ কার্যক্রম আরও আগে শুরু করতে হবে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, আগাম প্রস্তুতি এবং ধাপে ধাপে সমন্বিত কাজের মাধ্যমেই পহেলা জানুয়ারির বই উৎসবে শতভাগ বই সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব।
সংখ্যার হিসাবে ঘাটতি হয়তো মাত্র এক শতাংশ, কিন্তু এই এক শতাংশই কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় প্রভাব ফেলছে। নতুন বই ছাড়া শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে অনেক স্কুলে। তাই দ্রুত বিতরণ শেষ করাই এখন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রধান প্রত্যাশা।








