Logo

পড়াশোনায় বড় ছেদ : বারবার বন্ধের মাশুল দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১০ মার্চ, ২০২৬, ১৫:০৩
পড়াশোনায় বড় ছেদ : বারবার বন্ধের মাশুল দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা
ফাইল ছবি

বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা নানা পরিস্থিতিতে সবার আগে বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। করোনাভাইরাস মহামারির পর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখার প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। তাদের মতে, বারবার এমন সিদ্ধান্তের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ঘাটতি, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায়।

বিজ্ঞাপন

২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনা মহামারি শুরু হলে ১৭ মার্চ থেকে একযোগে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে ক্লাস শুরু করে এবং ধীরে ধীরে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও ভার্চুয়াল শিক্ষায় যুক্ত হয়। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়। সেই সময় প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

করোনার পরেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ঘটনা থেমে থাকেনি। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিলে ২১ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ রাখা হয়। আবার গত বছরের ২১ নভেম্বর একটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরে সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় অর্ধমাস বন্ধ ছিল।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য দুর্যোগের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। দুর্যোগের সময় অনেক স্কুল-কলেজকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যার ফলে শিক্ষাকার্যক্রমও স্থগিত থাকে। এর বাইরে রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে দীর্ঘ ছুটি, জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র হিসেবে বিদ্যালয় ব্যবহারের কারণে ক্লাস বন্ধ থাকার ঘটনাও নিয়মিত।

শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বিভিন্ন সময় শিক্ষার্থী আন্দোলন বা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেন। আবার আন্দোলন দমনেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থান দমনের প্রেক্ষাপটে ১৭ জুলাই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং প্রায় এক মাস পর ১৮ আগস্ট সেগুলো পুনরায় খোলা হয়।

শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণেও শিক্ষাকার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। সর্বজনীন পেনশন স্কিম বাতিলের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা টানা আট দিন ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেছিলেন। একইভাবে গত বছরের নভেম্বরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা বেতন স্কেল উন্নীত করার দাবিতে কয়েকদিন পাঠদান বন্ধ রাখেন।

বিজ্ঞাপন

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত এসেছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের কারণ দেখিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে অনেক শিক্ষাবিদ মনে করেন, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে কখনও কখনও রাজনৈতিক প্রভাবও কাজ করে।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে কর্মরত কারিগরি ও ডিজিটাল শিক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. মো. আকতারুজ্জামান মনে করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রাখা সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। তার মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ক্লাস না নিলেও বেতন-ভাতা পাবেন, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি সম্পন্ন করতেও দেরি হবে।

তিনি বলেন, করোনা মহামারির পর যদি দেশে ব্লেন্ডেড বা সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা কার্যকরভাবে চালু করা যেত, তাহলে কোনো পরিস্থিতিতেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতো না।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমানের মতে, বিভিন্ন দুর্যোগের সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু এর ফলে শিক্ষার্থীদের যে ক্ষতি হয়, তা সহজে পূরণ করা সম্ভব নয়।

তার মতে, দেশে ভূমিকম্প, খরা বা অন্যান্য দুর্যোগ আসতেই পারে। কিন্তু প্রতিবারই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে প্রথমে বন্ধ করার প্রবণতা ঠিক নয়। তিনি মনে করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যুক্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করার সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং অনেক সময় এর পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতিও ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, দুর্যোগকালে শিক্ষাব্যবস্থা চালু রাখার বিকল্প পরিকল্পনা দেশে এখনো কার্যকরভাবে তৈরি হয়নি। কোভিড-পরবর্তী সময়ে এমন পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তা হয়নি। ফলে কোনো সংকট দেখা দিলেই সহজ সমাধান হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখলে বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় শিক্ষার্থীদের শেখার ঘাটতি আরও বাড়বে। ইতোমধ্যে দেশে বড় ধরনের ‘লার্নিং গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে হলে নিয়মিত ক্লাস, গবেষণা, ল্যাব ও লাইব্রেরি কার্যক্রম সচল রাখা প্রয়োজন।

তাদের মতে, যদি কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতেই হয়, তাহলে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সমন্বিত পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ থাকা দরকার। না হলে শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটে রূপ নিতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD