বাবাকে হারিয়েও থামেনি যমজ দুই বোনের স্বপ্নের লড়াই

জীবনের কঠিন বাস্তবতা, বাবাকে হারানোর বেদনা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব বাধা পেরিয়ে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন শেরপুরের যমজ দুই বোন তাসনোভা আনজুম তাসমি ও তাবাসসুম আনজুম তানহা। স্কুল ও কলেজজীবনের মতো এবার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনও একসঙ্গে শুরু করতে যাচ্ছেন তারা। দুজনই ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিজ্ঞাপন
শেরপুর সদর উপজেলার বাগরাকসা গ্রামের এই দুই মেধাবী শিক্ষার্থী নিজেদের অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন এক অনুপ্রেরণার গল্প। সোমবার শেরপুর সরকারি কলেজে আয়োজিত বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তারা নিজেদের সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরেন।
তাসনোভা আনজুম তাসমি ও তাবাসসুম আনজুম তানহা দুজনই শেরপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেছেন। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপেই তারা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। এসএসসি ও এইচএসসি—দুই পরীক্ষাতেই তারা গোল্ডেন জিপিএ-৫ অর্জন করেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাতেও তাদের সাফল্য ছিল চোখে পড়ার মতো। তাসমি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৯৮তম স্থান অর্জন করে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে তানহা ২৯২৫তম স্থান অর্জন করে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগে সুযোগ পেয়েছেন।
শুধু শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, তারা দুজনই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। পাশাপাশি পৃথকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও সুযোগ পেয়েছেন তারা।
দুই বোন জানান, তাদের এই অর্জনের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন মহান আল্লাহ এবং তাদের মা। ভর্তি পরীক্ষার পুরো সময়ে মা সবসময় পাশে ছিলেন। পাশাপাশি কলেজের শিক্ষকদের সহযোগিতাও তাদের এগিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত আসে ২০২০ সালে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাদের বাবা মো. ছানোয়ার হোসেন তরফদার। তিনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করতেন। বাবার মৃত্যুর পর পরিবারে নেমে আসে গভীর শোক ও অনিশ্চয়তা। কিন্তু সেই দুঃসময়েও ভেঙে পড়েননি দুই বোন।
আবেগঘন কণ্ঠে তারা বলেন, বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আজকের এই সাফল্যে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তিনি তাদের এই অর্জন দেখে যেতে পারেননি।
আরও পড়ুন: অষ্টম শ্রেণির অনলাইন রেজিস্ট্রেশন স্থগিত
বিজ্ঞাপন
দুই বোনের স্বপ্ন, ভবিষ্যতে নিজেদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং দেশের জন্য ভালো কিছু করা। তারা সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন, যেন শিক্ষাজীবনে আরও এগিয়ে গিয়ে সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারেন।
সন্তানদের সাফল্যে আবেগাপ্লুত মা তাসলিমা বেগম বলেন, দীর্ঘদিনের কষ্ট, সংগ্রাম আর দোয়ার ফল আজ তিনি দেখতে পাচ্ছেন। তার সবচেয়ে বড় চাওয়া, সন্তানরা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশের জন্য কাজ করতে পারে।
তিন ভাই-বোনের মধ্যে যমজ দুই মেয়ের এমন অসাধারণ সাফল্যে গর্বিত পুরো পরিবার। স্থানীয়দের কাছেও তারা এখন অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।








