চরম শিক্ষক সংকটে রাবি, পিছিয়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩৪টিতে ২৫ জন বা তার বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন মাত্র একজন শিক্ষক।
বিজ্ঞাপন
উচ্চশিক্ষার মান নির্ধারণে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতকে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষককে কাম্য অনুপাত ধরা হয়। সর্বোচ্চ সহনীয় সীমা হিসেবে প্রতি ২০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক বিবেচনা করা হয়।
ইউজিসির ২০২৫ সালে প্রকাশিত ৫০তম বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি ১৫ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অনুপাত ১৮ জনে একজন। বিপরীতে রাবিতে প্রতি ২১ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন।
তবে রাবির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও কঠিন। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ১ হাজার ২০০ জন। সেই হিসাবে একজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৫ জন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
ইউজিসির গত পাঁচটি বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণেও অনুপাতের ওঠানামা দেখা যায়। ৪৬তম প্রতিবেদনে প্রতি ৩৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক থাকলেও ৪৭তম প্রতিবেদনে তা বেড়ে ৩৫ জনে দাঁড়ায়। পরবর্তী তিন প্রতিবেদনে অনুপাত ছিল যথাক্রমে ২৪, ২০ ও ২১ জনে একজন।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বেশি সংকট মাইক্রোবায়োলজিতে
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি ৫৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্সে প্রতি ৪৬ জন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে ৪১ জন এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ৪০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে রয়েছেন একজন শিক্ষক।
বিজ্ঞাপন
সংস্কৃত বিভাগে এই অনুপাত ৩৮ জনে একজন। চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র এবং অর্থনীতিতে ৩৫ জনে একজন; আইবিএতে ৩৪ জনে একজন এবং চিকিৎসা মনোবিজ্ঞানে ৩৩ জনে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
মার্কেটিংয়ে ৩২ জন, ইতিহাসে ৩১ জন এবং আইন ও ভূমি প্রশাসন, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ইংরেজিতে ৩০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
দর্শনে ২৯, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে ২৮ এবং ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, ইসলামিক স্টাডিজ ও ফাইন্যান্সে ২৭ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
১৭ বিভাগে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো
অন্যদিকে ১৭টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ইউজিসির কাম্য সীমার মধ্যে রয়েছে। সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ। সেখানে প্রতি সাতজন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগে আটজন, নাট্যকলায় নয়জন এবং ফার্মেসিতে ১০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেসে ১১ জন, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ও পদার্থবিজ্ঞানে ১২ জন এবং ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ১৩ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন।
পপুলেশন সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট, ক্রপ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, রসায়ন ও ফিশারিজে প্রতি ১৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক রয়েছেন। সমাজকর্ম, উদ্ভিদবিজ্ঞান, লোক প্রশাসন এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় এই অনুপাত ১৫ জনে একজন।
শিক্ষক সংকটে বাড়ছে একাডেমিক চাপ
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার বানু বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত শিক্ষার মানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন ও সমস্যার দিকে আলাদাভাবে নজর দেওয়া শিক্ষকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষকসংখ্যা কম এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষার্থী ভর্তি বেশি। ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাবির ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেলের (আইকিউএসি) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবু রেজা বলেন, অনুপাত ঠিক না থাকলে শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ তৈরি হয়। এতে কার্যকর পাঠদান কঠিন হয়ে পড়ে এবং শিক্ষার মানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তিনি জানান, মাইক্রোবায়োলজির মতো কয়েকটি বিভাগে পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। আবার কিছু বিভাগে অনুমোদিত শিক্ষক পদ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি হয়নি। এসব পদে দ্রুত নিয়োগ দেওয়া গেলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় সংকট তীব্র
রাবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম বলেন, দীর্ঘদিন শিক্ষক নিয়োগ বন্ধ থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কয়েক বছর নিয়মিত নিয়োগ না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ১৮ থেকে ২০ মাসে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন বিভাগে শূন্য পদগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগের চাহিদা অনুযায়ী পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তবে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ইউজিসির অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া গেলে শূন্য পদে নিয়োগের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হবে।
রাবির উপ-উপাচার্যের ভাষায়, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতে পৌঁছাতে না পারা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নেতিবাচক দিক। শিক্ষক সংকট কমিয়ে এই অনুপাত উন্নত করাকে প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে।







