৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, শেফালীর অর্জন জিপিএ ৪.২১

শৈশবে বাবাকে হারিয়ে পারিবারিক সংকটে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পড়াশোনা। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও বই-খাতার বদলে হাতে তুলে নিতে হয়েছিল সংসারের দায়িত্ব। বিয়ে, সন্তান লালন-পালন ও পরিবারের নানা ব্যস্ততায় কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়।
বিজ্ঞাপন
তবে শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায়নি। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরেই ৪৮ বছর বয়সে আবারও পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী বেগম। চার বছরের অধ্যবসায় শেষে ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ অর্জন করে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পশ্চিম ছাতনাই ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা শেফালী বেগম। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি (বিজনেস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড টেকনোলজি) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মূল জিপিএ ৩.৯৬ এবং ঐচ্ছিক বিষয়সহ জিপিএ ৪.২১ পেয়েছেন। তিনি গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন।
শেফালীর শিক্ষাজীবনের শুরুটা ছিল সম্ভাবনাময়। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে মেধাতালিকায় স্থান পাওয়া এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা অর্জনের। কিন্তু ছোটবেলায় বাবার মৃত্যু এবং পারিবারিক আর্থিক সংকট তাঁর সেই পথচলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে পড়াশোনা বন্ধ করে পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয় তাঁকে। পরে বিয়ে ও তিন সন্তানের লালন-পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। নিজের শিক্ষাজীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়নি দীর্ঘদিন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে মনের ভেতর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা বেঁচে ছিল। একসময় স্বামী ও সন্তানদের অনুপ্রেরণায় ৪৮ বছর বয়সে নতুন করে পড়াশোনা শুরু করেন শেফালী। দীর্ঘ শিক্ষাবিরতির কারণে শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জ থাকলেও সংসারের দায়িত্ব সামলে নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যান। অবশেষে তাঁর পরিশ্রম সাফল্যে রূপ নেয়।
মায়ের এই অর্জনে আনন্দিত বড় ছেলে আব্দুর রাজ শাফি। তিনি বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার কিয়াংসাং বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে অধ্যয়নরত। তিনি বলেন, মায়ের এই সাফল্য আমাদের পরিবারের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। তাঁর ত্যাগ, দোয়া ও অনুপ্রেরণার কারণেই আমরা আজ প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। আমি চাই, মা এখানেই থেমে না থেকে স্নাতকসহ আরও উচ্চশিক্ষা অর্জন করুন।
বিজ্ঞাপন
শেফালীর মেয়ে মাকছুরা খানম নাসমুন রংপুর সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। মায়ের সাফল্যকে নারীদের জন্য অনুপ্রেরণার উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মায়ের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের আনন্দের বিষয় নয়, এটি সমাজের সব নারী ও শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের জন্য অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কখনো শিক্ষার পথে বাধা হতে পারে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শেফালীর অধ্যবসায় প্রশংসিত হয়েছে। গোমনাতি টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপ রায় বলেন, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এমন সংগ্রামী শিক্ষার্থী খুব কমই দেখেছি। শেফালী বেগম প্রমাণ করেছেন, শিক্ষা বয়সের কাছে নয়, ইচ্ছাশক্তির কাছেই হার মানে। তাঁর সাফল্য অন্যদেরও নতুন করে স্বপ্ন দেখতে অনুপ্রাণিত করবে।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে শেফালী বেগম বলেন, ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে সংসারের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষাগুলোতে বরাবরই মেধাতালিকায় ছিলাম। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারিনি। পরে স্বামী ও সন্তানদের উৎসাহে আবার পড়াশোনা শুরু করি। আজ ৪.২১ জিপিএ নিয়ে এইচএসসি পাস করতে পেরে মনে হচ্ছে, জীবনের একটি বড় স্বপ্ন পূরণ হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তাঁর স্বামী মকছেদুল আলম মজনু বলেন, শেফালী পরিবারের জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন ত্যাগ করেছে। দীর্ঘদিন পর নিজের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় আনন্দ। তার এই সাফল্যে আমরা সবাই গর্বিত। ভবিষ্যতেও তার পড়াশোনার পথে পাশে থাকব।
পরিবারের ছোট সদস্যদের কাছেও শেফালী এখন অনুকরণীয়। তাঁর নাতনি ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শারাফি রাজ দাদির সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে, আমার দাদি আমার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। ৫২ বছর বয়সে দাদি এইচএসসি পাস করেছেন, এতে আমি ভীষণ খুশি ও গর্বিত। দাদির এই সাফল্য দেখে আমিও পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। বড় হয়ে আমি চিকিৎসক হতে চাই। দাদি আমাকে শিখিয়েছেন, মন দিয়ে চেষ্টা করলে কোনো স্বপ্নই অসম্ভব নয়।
একসময় পারিবারিক বাস্তবতার কারণে যে নারীকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল, আজ তাঁর অর্জনই পরিবারের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষার অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। ৪৮ বছর বয়সে আবার বই হাতে নেওয়া এবং ৫২ বছরে এইচএসসি উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়ে শেফালী বেগম দেখিয়েছেন, দীর্ঘ বিরতির পরও শিক্ষার পথে ফেরা সম্ভব।
বিজ্ঞাপন
তাঁর এই সাফল্য শুধু একটি পরীক্ষায় ভালো ফল করার গল্প নয়; বরং জীবনের নানা প্রতিকূলতায় যাঁদের পড়াশোনা থেমে গেছে, তাঁদের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জোগানো এক অনন্য দৃষ্টান্ত।








