ক্যামেরায় অস্বস্তি: ‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’ নিয়ে ক্ষোভে তারকারা

একসময় বিনোদন সাংবাদিকতা মানেই ছিল তারকাদের কাজ, ফ্যাশন ও ব্যক্তিজীবনের গল্প ঘিরে স্বাভাবিক ও সুস্থ উপস্থাপনা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও সামাজিক মাধ্যমের বিস্তারের ফলে বিনোদন সাংবাদিকতায় যেমন গতি এসেছে, তেমনি জন্ম নিয়েছে একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা—যেখানে ভিউ বাড়ানোর নেশায় অনেকেই নৈতিকতার সীমা অতিক্রম করছেন।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছোট ভিডিও বা রিলসে এখন প্রায়ই দেখা যায় অস্বস্তিকর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দৃশ্য। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত একটি প্রবণতা হলো তথাকথিত ‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’। এই পদ্ধতিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ক্যামেরা এমনভাবে ধরা হয়, যাতে তারকাদের পোশাকের আড়ালে থাকা স্পর্শকাতর অংশ ফ্রেমে আসে। ফলে বিষয়টি বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
বিনোদন অঙ্গনের বিভিন্ন অনুষ্ঠান—লাল গালিচা, পণ্য উদ্বোধন কিংবা অন্যান্য আয়োজন—এখন এমন ভিডিও ধারণের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। তারকাদের এক ঝলক দেখার আশায় জমে ওঠা ভিড়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন অসংখ্য অপেশাদার কন্টেন্ট নির্মাতা, যাদের অনেকের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। পেশাদার সাংবাদিকদের পাশাপাশি এসব ব্যক্তির উপস্থিতি অনেক সময় পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বিব্রতকর ঘটনার খবর সামনে এসেছে। একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, এক চিত্রনায়কের স্ত্রী ইভেন্টে বসে থাকা অবস্থায় ওপর দিক থেকে ক্যামেরা তাক করায় অস্বস্তিতে পড়েন। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি নিজেই ক্যামেরা নামানোর অনুরোধ জানান। এ ধরনের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং নিয়মিতই ঘটছে।
গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন পরিচিত অভিনেত্রীও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের এই অবস্থান প্রমাণ করে, বিষয়টি আর উপেক্ষা করার মতো পর্যায়ে নেই।
সচেতন দর্শকদের একাংশও এই প্রবণতায় বিরক্ত। তাদের মতে, অনেক সময় ভিডিওর থাম্বনেইল বা ক্যামেরার অ্যাঙ্গেলই বিব্রতকর হয়ে ওঠে, যা সুস্থ বিনোদনের পরিপন্থী এবং এক ধরনের সাইবার বুলিং।
বিজ্ঞাপন
একজন ভুক্তভোগী অভিনেত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এমন আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জরুরি হলেও বাস্তবে এর সমাধান কঠিন। তার ভাষায়, অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবেই এসব করেন, ফলে শুধু লেখালেখি দিয়ে তাদের মানসিকতা পরিবর্তন সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, প্রত্যেককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে।
এ বিষয়ে সচেতন মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, সামাজিক মাধ্যমে নারী শিল্পীদের নিয়ে অশালীন মন্তব্য, বিকৃত ভিডিও ছড়ানো ও বিদ্রূপ করা এখন অস্বাভাবিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে গেছে। যা শুধু অনৈতিক নয়, অনেক ক্ষেত্রে আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা সাংবাদিকতার নীতিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। বিনোদন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্তদের মতে, কনটেন্ট জনপ্রিয় করার চেষ্টা স্বাভাবিক হলেও তা অবশ্যই নৈতিকতার সীমার মধ্যে থাকা উচিত। অন্যথায় এটি আর সাংবাদিকতা থাকে না।
বিজ্ঞাপন
এই সমস্যার পেছনে ইভেন্ট আয়োজনের দুর্বল ব্যবস্থাপনাকেও দায়ী করা হচ্ছে। বিদেশে বড় আয়োজনগুলোতে সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহকদের জন্য আলাদা স্থান নির্ধারণ করা হলেও দেশে তা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে এবং অপেশাদারদের অনুপ্রবেশ সহজ হচ্ছে।
এছাড়া মোবাইল সাংবাদিকতার প্রসারের আড়ালে অনেকেই নিজেদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিচ্ছেন, যদিও তাদের কাজের সঙ্গে পেশাদারিত্বের মিল নেই। এতে প্রকৃত সাংবাদিকরাও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। ইভেন্ট আয়োজকদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, পেশাদারদের প্রশিক্ষণ, এবং অনৈতিক কনটেন্ট নির্মাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হতে পারে একটি সুস্থ বিনোদন পরিবেশ।
‘টপ অ্যাঙ্গেল ভিডিও’র এই প্রবণতা শুধু তারকাদের ব্যক্তিগত স্বস্তি নষ্ট করছে না; এটি পুরো বিনোদন সাংবাদিকতার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।








