পটুয়াখালী গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বিশ্বতারকা শাকিরা

বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরকে ঘিরে যখন নতুন করে আলোচনায় উঠে আসেন কলম্বিয়ান সংগীতশিল্পী শাকিরা, তখন তার ক্যারিয়ারের একটি মানবিক অধ্যায়ের কথাও স্মরণ করছেন অনেকেই। ‘ওয়াকা ওয়াকা’ ও ‘লা লা লা’র মতো জনপ্রিয় গানের মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বকাপের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে যাওয়া এই বিশ্বখ্যাত তারকা একসময় নীরবে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। সেই সফরে ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্দশা দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।
বিজ্ঞাপন
২০০৭ সালের নভেম্বরে আঘাত হানা ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডর দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। হাজারো মানুষ প্রাণ হারায়, অসংখ্য পরিবার হারায় তাদের স্বজন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার উৎস। দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অবস্থা সরেজমিনে দেখতে এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে বাংলাদেশ সফরে আসেন শাকিরা।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকায় পৌঁছানোর পর খুব বেশি সময় রাজধানীতে অবস্থান করেননি তিনি। সফরের মূল লক্ষ্য ছিল দুর্যোগকবলিত মানুষের জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখা এবং বিশেষ করে শিশুদের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। এ কারণে দ্রুতই তিনি দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর উদ্দেশে রওনা হন।
বিজ্ঞাপন
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পটুয়াখালীর সিডর-আক্রান্ত অঞ্চল পরিদর্শন। সেখানে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন এবং শিশুদের পাশে সময় কাটান। ধ্বংসস্তূপের মাঝেও শিশুদের জীবনসংগ্রাম, আশা ও স্বপ্ন তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি তিনি শিশুদের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির কথাও মনোযোগ দিয়ে শুনেছিলেন।
সেই সফরের একটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়ে ওঠে। সিডরে মা-বাবাকে হারানো ১১ বছর বয়সী এক কিশোরীর সঙ্গে দেখা হয়েছিল শাকিরার। শিশুটি তাকে একটি শোকগাথা গান শোনায়, যার মর্মার্থ ছিল হারিয়ে যাওয়া মায়ের কাছে ফিরে পাওয়ার আকুতি। গানটি শুনে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হন শাকিরা। পরবর্তীতে তিনি স্মরণ করেছিলেন, ওই শিশুর কণ্ঠে লুকিয়ে থাকা বেদনা তাকে নাড়া দিয়েছিল এবং সেই অভিজ্ঞতা তার মনে দীর্ঘদিন ধরে গেঁথে ছিল।

তবে শুধুই দুঃখ নয়, দুর্যোগের মধ্যেও শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য ও স্বপ্ন তাকে আশাবাদী করেছিল। ক্ষতিগ্রস্ত একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও শিশুরা খেলছে, গান গাইছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখছে। কেউ চিকিৎসক হতে চায়, কেউ নার্স। তাদের এই ইতিবাচক মনোভাব তাকে মুগ্ধ করেছিল।
বিজ্ঞাপন
সিডরের ধ্বংসযজ্ঞ কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে শাকিরা গভীরভাবে বিচলিত হয়েছিলেন। পুরো গ্রাম ধ্বংস হয়ে যাওয়া, মানুষের সবকিছু হারিয়ে ফেলা এবং অসংখ্য পরিবারের শোকাবহ পরিস্থিতি তাকে মানসিকভাবে ভারাক্রান্ত করে। বিশেষ করে সন্তান হারানো মায়েদের কষ্টের কথা তিনি বারবার উল্লেখ করেছিলেন।
বাংলাদেশ সফরের সময় তিনি শুধু উপকূলীয় এলাকাই নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ইউনিসেফ পরিচালিত শিশু-কেন্দ্রিক কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। রাজশাহীতে শিশুদের জন্য পরিচালিত একটি প্রকল্প ঘুরে দেখেন, যেখানে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশের সুযোগ পায়।
আরও পড়ুন: ভয়াবহ দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত অভিনেতা জোভান
বিজ্ঞাপন
শিশুদের কল্যাণে কাজ করার বিষয়টি শাকিরার জীবনে নতুন নয়। অল্প বয়স থেকেই তিনি এই বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। কৈশোরেই তিনি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহায়তায় একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তার নিজের শৈশবের কিছু কঠিন অভিজ্ঞতা এবং সমাজের অবহেলিত শিশুদের জীবনসংগ্রাম তাকে মানবিক উদ্যোগে যুক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছিল।
বাংলাদেশ সফরটিকে ইচ্ছাকৃতভাবেই প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়। ইউনিসেফ সংশ্লিষ্টরা সে সময় জানিয়েছিলেন, শাকিরা নিজেই চেয়েছিলেন সফরটি যেন আনুষ্ঠানিকতা ও প্রচারণার চেয়ে বাস্তব পরিস্থিতি জানার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগে। তিনি মানুষের জীবনযাপন, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে কাছ থেকে বুঝতে আগ্রহী ছিলেন।
সফর শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের শিশু ও দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে আরও বেশি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান এই বিশ্বখ্যাত শিল্পী। তার মতে, সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আজ যখন বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা শাকিরার গান ও মঞ্চ পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা করেন, তখন অনেকের অজানাই থেকে যায় তার জীবনের এই মানবিক অধ্যায়। প্রায় দুই দশক আগে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের গল্প শুনেছিলেন তিনি, তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছিলেন এবং তাদের কষ্ট ও স্বপ্নকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করে ফিরে গিয়েছিলেন।








