Logo

হিজাব ছাড়া গান পরিবেশন, গায়িকাকে ৭৪ চাবুক মারার নির্দেশ

profile picture
বিনোদন ডেস্ক
২০ জুন, ২০২৬, ১৮:২৮
হিজাব ছাড়া গান পরিবেশন, গায়িকাকে ৭৪ চাবুক মারার নির্দেশ
ছবি: সংগৃহীত

ইরানে হিজাব ছাড়া গান পরিবেশন করাকে কেন্দ্র করে আলোচিত গায়িকা পারাস্তু আহমাদি এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির আদেশ দিয়েছে দেশটির একটি আদালত। ‘অশ্লীল ও অনৈতিক কনটেন্ট’ প্রচারের অভিযোগে তাকে এবং তার দলের আট সদস্যকে ৭৪টি করে দোররা মারার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পারাস্তুর ওপর দুই বছরের জন্য বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন না এবং দেশ ছাড়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এ ঘটনায় দেশটির ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন, সংস্কৃতিকর্মী এবং অধিকারকর্মীরা এই শাস্তিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নতুন আঘাত হিসেবে দেখছেন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। সে সময় ২৯ বছর বয়সী পারাস্তু আহমাদি ইউটিউবে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি অনুষ্ঠানে ‘আজ খুনে জাভানানে ওয়াতান’ শিরোনামের দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের সময় তিনি প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী হিজাব পরেননি, যা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

বিজ্ঞাপন

গানটি অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোচিত হয়। তবে ইরানের কর্তৃপক্ষ একই কনটেন্টকে ‘অশ্লীল’ হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত শুরু করে।

গানটি প্রকাশের কিছুদিন পরই পারাস্তু আহমাদি এবং তার কয়েকজন সহশিল্পীকে আটক করা হয়। পরবর্তীতে তারা মুক্তি পেলেও তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে সম্প্রতি আদালত এ রায় ঘোষণা করে।

রায়ে শুধু দোররা মারার শাস্তিই নয়, বরং শিল্পীর পেশাগত ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপরও একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এতে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রায় ঘোষণার পর থেকেই মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর তীব্র সমালোচনা করছে। তাদের মতে, এটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক বা আইনি বিষয় নয়; বরং শিল্পী ও ভিন্নমতের মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি দৃষ্টান্ত।

মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, ইরানে দীর্ঘদিন ধরেই শিল্পী, লেখক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সংস্কৃতিকর্মীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক এই রায় সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে তারা মনে করছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’-এর অ্যাডভোকেসি পরিচালক বাহার ঘান্দেহারি এ ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, শুধুমাত্র গান গাওয়া এবং হিজাব ছাড়া প্রকাশ্যে উপস্থিত হওয়ার কারণে একজন শিল্পীকে এমন কঠোর শাস্তি দেওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, এই ঘটনা ইরানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মানবাধিকারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা তুলে ধরে।

এদিকে ইরানি অধিকারকর্মীদের আইনি সহায়তাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘দাদবান’-এর মানবাধিকার আইনজীবী মইন খাজায়েলি আদালতের রায়ের আইনি ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ইরানের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী নারীদের গান গাওয়া বা সংগীত পরিবেশন করাকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে এসব কর্মকাণ্ডকে ‘অশ্লীল কনটেন্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া আইনের অপপ্রয়োগের শামিল হতে পারে।

তার দাবি, বিচারিক সিদ্ধান্তে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তা বিদ্যমান আইন ও সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

রায় প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিবাদের সুর শোনা গেছে। ইরানি-ব্রিটিশ অভিনেত্রী নাজানিন বোনিয়াদি, নির্বাসিত ইরানি অভিনেত্রী সেতারেহ মালেকিসহ বহু শিল্পী, অধিকারকর্মী ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছেন।

বিজ্ঞাপন

তাদের বক্তব্য, শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চাকে অপরাধ হিসেবে দেখার প্রবণতা সমাজে ভয় ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি করে। একই সঙ্গে এটি সৃজনশীলতার পরিসর সংকুচিত করে এবং শিল্পীদের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করে।

বিশ্লেষকদের মতে, পারাস্তু আহমাদির বিরুদ্ধে দেওয়া এই রায় ইরানে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, নারীর অধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চলমান বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভবিষ্যতে এ বিষয়ে আরও কূটনৈতিক ও মানবাধিকারভিত্তিক আলোচনা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD