Logo

শৈশবের অনন্য রূপকার পারুল-বাউলের স্রষ্টা মুস্তাফা মনোয়ার

profile picture
বিনোদন প্রতিবেদক
২৯ জুন, ২০২৬, ১৩:৩৭
শৈশবের অনন্য রূপকার পারুল-বাউলের স্রষ্টা মুস্তাফা মনোয়ার
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র, প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও পাপেটশিল্পের অগ্রদূত মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। তাঁর মৃত্যুতে শুধু শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনই নয়, শোকাহত হয়ে পড়েছে এমন একটি প্রজন্ম, যাদের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টি। বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় শিশুতোষ অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ এবং তার দুই অবিস্মরণীয় চরিত্র পারুল ও বাউল আজও অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে অমলিন।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২৯ জুন) সকালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেকেই ফিরে গেছেন শৈশবের সেই দিনগুলোয়, যখন সাদাকালো কিংবা পরবর্তী সময়ের টেলিভিশনের পর্দায় পারুল, বাউল আর তাদের হাসি-আনন্দে ভরা গল্প শিশুদের নির্মল বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল।

শুধু একজন খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী হিসেবেই নয়, বাংলাদেশের আধুনিক পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। টেলিভিশনের মাধ্যমে পুতুলকে জীবন্ত চরিত্রে রূপ দিয়ে শিশুদের সামনে নতুন ধরনের বিনোদন ও শিক্ষার জগৎ উন্মোচন করেছিলেন তিনি। তাঁর নির্মিত চরিত্রগুলো শুধু হাসি-আনন্দই ছড়ায়নি, শিশুদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতাকেও সমৃদ্ধ করেছে।

বিজ্ঞাপন

‘মনের কথা’ অনুষ্ঠানে পারুল ও বাউলের প্রাণবন্ত সংলাপ, বাউলের একতারা হাতে গান আর মাঝেমধ্যে গরুর পরিচিত ‘হাম্বা’ ডাক দর্শকদের কাছে হয়ে উঠেছিল বিশেষ আকর্ষণ। সেই অনুষ্ঠান নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে শিশুদের কাছে ছিল অন্যতম জনপ্রিয় আয়োজন। সময়ের ব্যবধানে দর্শক বড় হলেও সেই স্মৃতি আজও অনেকের হৃদয়ে অমলিন।

তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মনের কথা’র পুরোনো ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওগুলোর মন্তব্যে অসংখ্য মানুষ শৈশবের স্মৃতি ভাগাভাগি করছেন, প্রিয় শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করছেন। অনেকেই লিখেছেন, তাঁদের শৈশবের আনন্দের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার।

চারুকলায় শিক্ষাজীবন শেষ করলেও পেশাগত জীবনে তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি কেবল চিত্রকলার মধ্যে। শিক্ষকতা, টেলিভিশন প্রযোজনা, নির্দেশনা, শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং পাপেটশিল্প—সব ক্ষেত্রেই রেখেছেন অনন্য অবদান। বিশেষ করে পাপেট ছিল তাঁর সবচেয়ে প্রিয় সৃজনভুবন, যার সঙ্গে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

কলকাতা আর্ট কলেজ থেকে শিক্ষা সম্পন্ন করে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করার পর পাপেটশিল্প নিয়ে তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়। তবে এই আগ্রহের বীজ রোপিত হয়েছিল শৈশবেই। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাকে আধুনিক রূপ দিয়ে বাংলাদেশে কাহিনিনির্ভর পাপেট নাটক নির্মাণ ও উপস্থাপনায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

নিজস্ব পাপেট দল এবং বাংলাদেশের লোকজ পাপেট দল ‘ধনমিয়া’কে নিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। মস্কো ও তাশখন্দ সফরে তাঁর পরিবেশনা বিদেশি দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করে। এসব উপস্থাপনায় তিনি বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্র ‘পারুল’-এর নাম নেওয়া হয়েছিল বাংলার লোককথা ‘সাত ভাই চম্পা’ থেকে। শিশুদের আনন্দের পাশাপাশি শিক্ষামূলক বার্তা পৌঁছে দিতে তিনি এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে নানা আয়োজন নির্মাণ করেন। বিনোদনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার এই প্রয়াস তাঁকে আলাদা মর্যাদা এনে দেয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে টেলিভিশন পাপেটশিল্পের বিকাশেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ষাটের দশকের শুরুতে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কলিম শরাফীর একটি প্রামাণ্যচিত্রে প্রথম তাঁর পাপেট ব্যবহার করা হয়। পরে টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে নতুন ধরনের পাপেট নাটক উপস্থাপন করেন তিনি।

১৯৬৭-৬৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাঁর পাপেট নাটকগুলো কেবল বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকদের বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী অবস্থান এবং রাজনৈতিক বাস্তবতাকেও তুলে ধরা হতো। ফলে তাঁর শিল্পকর্ম সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিজ্ঞাপন

পারিবারিকভাবেও মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উত্তরসূরি। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান কবি গোলাম মোস্তফা ও জমিলা খাতুন দম্পতির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে বেড়ে ওঠার কারণে ছোটবেলা থেকেই শিল্পচর্চার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে।

শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে দেশের গণমাধ্যম, শিল্প ও সংস্কৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। শিল্পচর্চা, সাংস্কৃতিক সংগঠন, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং শিশুদের সৃজনশীল বিকাশে তাঁর বহুমাত্রিক অবদান তাঁকে দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে একটি অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবে তাঁর সৃষ্টি করা পারুল, বাউল এবং অসংখ্য পাপেট চরিত্র ভবিষ্যতেও নতুন প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের শিশুতোষ বিনোদন ও সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল অধ্যায় হয়ে বেঁচে থাকবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD