সরকারি অ্যাম্বুলেন্স যেন শো-পিস, সেবা পাচ্ছে না রোগীরা

রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক সংকটের কারণে সেগুলোর বেশিরভাগই অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে জরুরি সময়ে রোগীরা সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে বাধ্য হচ্ছেন বেশি খরচে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করতে।
বিজ্ঞাপন
জেলার সবচেয়ে বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালে বর্তমানে চারটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক রয়েছেন মাত্র একজন। অথচ এখানে চালকের অনুমোদিত পদ দুটি। প্রায় দুই বছর আগে একজন চালক অবসরে যাওয়ার পর থেকে একাই দায়িত্ব পালন করছেন অপর চালক, যা দিয়ে পুরো জেলার রোগী সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
সদর হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তিনটি অ্যাম্বুলেন্স নতুন ভবনের গ্যারেজে দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। কোনোটি ধুলায় ঢেকে গেছে, আবার কোনোটি টায়ার বসে গিয়ে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। শুধুমাত্র একটি অ্যাম্বুলেন্স চালু রয়েছে, যা দিয়ে সীমিত পরিসরে রোগী পরিবহন করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
একই চিত্র দেখা গেছে রাজবাড়ী শহরের বেড়াডাঙ্গা এলাকায় অবস্থিত ২০ শয্যার মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে। এখানে একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও ২০২৩ সালে চালক অবসরে যাওয়ার পর থেকে সেটি তালাবদ্ধ অবস্থায় গ্যারেজে পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় গাড়িটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে ব্যবহার আরও কঠিন করে তুলবে।
পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে একটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক অবসরে যাওয়ার পর তিন বছর ধরে সেটি অচল অবস্থায় রয়েছে। ফলে ওই উপজেলার রোগীদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ওপর, যার জন্য গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
সদর হাসপাতালের একমাত্র চালক মাসুদ জানান, একা সব রোগীর চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। কোনো রোগীকে ঢাকায় নিয়ে গেলে আসা-যাওয়া মিলিয়ে প্রায় আট ঘণ্টা সময় লেগে যায়। এতে করে ফিরে এসে সঙ্গে সঙ্গে অন্য রোগীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। আগে দুইজন চালক থাকায় কাজ সহজ ছিল, এখন তা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
পাংশার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান শোভন বলেন, তার নবজাতক অসুস্থ হয়ে পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর নিতে গিয়ে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাননি। বাধ্য হয়ে তিনগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিতে হয়েছে, যা তার জন্য বড় আর্থিক চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
এছাড়া স্থানীয় বাসিন্দা সাখাওয়াত হোসেন জানান, চারটি অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও চালকের অভাবে একটি দিয়ে সেবা চালাতে হচ্ছে। ফলে সেটি অন্যত্র গেলে বাকি রোগীরা আর কোনো সুবিধা পান না।
মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের অভিযোগ, এখানে আসা অধিকাংশ রোগীই নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের পক্ষে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
রাজবাড়ী নাগরিক কমিটির সভাপতি জ্যোতিশংকর ঝন্টু বলেন, একদিকে অ্যাম্বুলেন্স পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে রোগীরা বেশি খরচ করে সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান জানান, চারটি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালকের সংখ্যা অপর্যাপ্ত। একজন চালক দিয়ে সব চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। অন্তত তিনজন চালক থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হতো। বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে সিভিল সার্জন ডা. এস. এম. মাসুদ বলেন, শুধু চালক নয়, স্বাস্থ্যখাতে আরও নানা ধরনের সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।
চালক সংকটের কারণে সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাজবাড়ীতে। দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।








