টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ করার হুঁশিয়ারি স্বাস্থ্যকর্মীদের

দেশের টিকাদান কার্যক্রম ও তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান শক্তি মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা—স্বাস্থ্য সহকারী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক ও পোর্টাররা। তবে দীর্ঘদিন ধরে বেতন বকেয়া, পদোন্নতির জটিলতা এবং চাকরির অনিশ্চয়তায় তারা চরম হতাশার মধ্যে রয়েছেন। দাবি পূরণে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হলেও কার্যকর সমাধান না পাওয়ায় এবার কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্যকর্মীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তাদের দাবিগুলো পূরণ না হলে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রমে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এতে চলমান বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি, বিশেষ করে হামের টিকা কার্যক্রম বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
দেশজুড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী পোর্টারদের অবস্থা সবচেয়ে সংকটপূর্ণ। তারা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে টিকা সরবরাহের কাজ করেন। অথচ গত ৯ মাস ধরে তাদের বেতন বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম এলাকায় টিকা পৌঁছে দেওয়ার পরও তারা নিয়মিত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না।
বিজ্ঞাপন
বান্দরবানের লামা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের পোর্টার সমীর চক্রবতী বলেন, প্রতিদিন পাহাড়ি এলাকায় কাঁধে টিকার বাক্স নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। কখনো সাইকেল, কখনো নৌকা কিংবা হেঁটে যেতে হয় টিকাকেন্দ্রে। মাসে ৩০ দিন কাজ করলেও পারিশ্রমিক পান সীমিত দিনের, তাও আবার বকেয়া পড়ে থাকে মাসের পর মাস। এতে তাদের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিদর্শকরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও গ্রেড উন্নয়নের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন। বাংলাদেশ হেলথ অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের অভিযোগ, বারবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি নেই। বর্তমানে তাদের প্রস্তাবিত ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আটকে রয়েছে।
সংগঠনের নেতা শাহাদুল ইসলাম রিপন বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে আরও কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন তারা। একই সঙ্গে ২৫ এপ্রিলের মধ্যে গেজেট প্রকাশ না হলে কর্মসূচি আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
প্রায় ১৫ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী, পরিদর্শক ও সহকারী পরিদর্শক ছয় দফা দাবিতে এক বছরের বেশি সময় ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে—গ্রেড উন্নয়ন, নিয়োগবিধি সংশোধন এবং টেকনিক্যাল পদমর্যাদা প্রদান। বর্তমানে তারা তিনটি দাবিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবির প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. জাহিদ রায়হানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১৫ দিনের মধ্যে সুপারিশ দিতে বলা হলেও নির্ধারিত বৈঠক না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
স্বাস্থ্য সহকারীদের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী মো. ওয়াসি উদ্দিন রানা জানান, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করা হবে। এর মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম বন্ধসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এতে ৩ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন পদ সৃষ্টি, পদোন্নতি ও নিয়োগ একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তাৎক্ষণিকভাবে সব দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ চলছে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের দাবিগুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর নির্ভর করে দেশের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্য। তাদের কর্মবিরতি বা শাটডাউনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই দ্রুত সমাধান না এলে দেশের স্বাস্থ্যখাত একটি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।







