Logo

দেশজুড়ে নতুন আতঙ্ক ‘হাম’, টিকা নিয়েও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৫১
দেশজুড়ে নতুন আতঙ্ক ‘হাম’, টিকা নিয়েও আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা
ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইতোমধ্যে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ২ কোটি শিশুকে লক্ষ্য করে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। তবুও উদ্বেগ কাটছে না, কারণ টিকা নেওয়ার পরও অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে—কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুও ঘটছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, হাম সন্দেহে ২ হাজার ৩১০ শিশুর মধ্যে ৫৪.৭ শতাংশ কোনো টিকাই নেয়নি। তবে ২২ শতাংশ শিশু প্রথম ডোজ নেওয়ার পর এবং ২৩.২ শতাংশ শিশু দুই ডোজ সম্পন্ন করার পরও আক্রান্ত হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের জন্য নতুন করে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ৭৫১ শিশুর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, এদের ৭১.৮ শতাংশ টিকাবিহীন। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরই টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি। তবে ১৭ শতাংশ এক ডোজ এবং ১১.২ শতাংশ পূর্ণ দুই ডোজ নেওয়ার পরও সংক্রমিত হয়েছে, যা টিকার কার্যকারিতা ও প্রয়োগ পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের প্রথম দুই মাসের তথ্যও উদ্বেগজনক। জানুয়ারিতে আক্রান্ত ৫৫০ শিশুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছিল। ফেব্রুয়ারিতেও একই চিত্র দেখা যায়—অনেক শিশু টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে।

বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের হার হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বড় উদ্বেগের বিষয়। গত কয়েক বছরে যেখানে এই হার ৬ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। একইভাবে ৯ থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের আক্রান্তের হারও বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র টিকাদান নয়, বরং হামের বিস্তারের পেছনের অন্যান্য কারণগুলোও খতিয়ে দেখা জরুরি। অনেক শিশুই টিকা নেওয়ার বয়সের আগেই আক্রান্ত হচ্ছে, আবার টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণ হচ্ছে—যা একটি জটিল জনস্বাস্থ্য সংকেত।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। সেখানে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক জানান, আগে ধারণা ছিল ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুরা মায়ের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে নিরাপদ থাকে, কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। ফলে কিশোরীদের বিয়ের আগে বুস্টার ডোজ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনার কথা উঠে এসেছে।

অন্যদিকে ভ্যাকসিন কাভারেজের তথ্যে অসঙ্গতির কথাও তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। কিছু এলাকায় ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত কভারেজ দেখানো হচ্ছে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মন্তব্য করেন সংশ্লিষ্টরা।

হামকে একটি অত্যন্ত সংক্রামক ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগ হিসেবে উল্লেখ করে চিকিৎসকরা বলেন, এটি শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব এবং হাসপাতালে আলাদা ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণেও সংক্রমণ ছড়াচ্ছে দ্রুত।

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে নিশ্চিতভাবে ২৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে। এছাড়া উপসর্গ নিয়ে বা সন্দেহজনক হিসেবে মারা গেছে আরও ১৫১ শিশু। অর্থাৎ এক মাসে মোট ১৭৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এই রোগে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ২ হাজার ৬৩৯ জন এবং সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে।

বর্তমানে সংক্রমণের দিক থেকে ঢাকা বিভাগ শীর্ষে রয়েছে, এরপর রয়েছে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগ।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতিতে সরকার টিকা গ্রহণের বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাসে এনেছে এবং বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করেছে। ইতোমধ্যে ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় প্রায় ১২ লাখ শিশুকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন এলাকাগুলোতেও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

আগামী ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী আরও বৃহৎ পরিসরে টিকাদান কার্যক্রম চালানো হবে, যার মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল টিকাদান নয়—হামের প্রকৃত কারণ, টিকার কার্যকারিতা এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা নিয়ে সমন্বিত গবেষণা এখন সময়ের দাবি।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD