Logo

ক্রমেই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, হটাৎ কেন মহামারীতে রূপ নিচ্ছে হাম?

profile picture
জাহিদ হাসান হৃদয়
১৪ এপ্রিল, ২০২৬, ২০:২৯
ক্রমেই বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা, হটাৎ কেন মহামারীতে রূপ নিচ্ছে হাম?
ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি এখন মহামারীর আশঙ্কা তৈরি করেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা—যাদের অনেকেই সময়মতো টিকা না পাওয়ায় মারাত্মক বিপদের মুখে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হাম সন্দেহে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া ১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত হামে ৩০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৬৪ জন।

১৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়েছে দুই হাজার ৮৯৭ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১৮ হাজার ১২৯ জন। যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতিরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় ও তথ্য সংগ্রহ সঠিকভাবে হচ্ছে না, বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

এই পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে সামনে এসেছে টিকার সংকট এবং টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাত। ২০২৩-২৪ ও ২৫ সালে বিভিন্ন কারণে, বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার ফলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

মাঠপর্যায়ে বহু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় টিকার সরবরাহ ছিল না। ফলে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়েও হাম প্রতিরোধী টিকা পায়নি। সেই ঘাটতির ফল এখন ভয়াবহভাবে সামনে আসছে।

সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশন এলাকাসহ বিভিন্ন বস্তি অঞ্চলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে রোগটি।

এছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতেও সংক্রমণের হার উদ্বেগজনক। সেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা থাকায় রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ ৫ এপ্রিল থেকে ১৮টি জেলায় বিশেষ হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করেছে।

এর পাশাপাশি ১২ এপ্রিল থেকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার জন্য মাঠপর্যায়ে কাজ করছে স্বাস্থ্যকর্মীরা।

বিজ্ঞাপন

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু ভর্তি বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। শিশু ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংকট দেখা দিচ্ছে, চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত চাপ। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে আনার কারণে রোগ জটিল হয়ে যাচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সাপোর্টিভ কেয়ারেরও ঘাটতি রয়েছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকাদানের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তারা আরও জানান, শুধু টিকা সরবরাহ বাড়ালেই হবে না—এর পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই মৃত্যুগুলো যেন নীরবেই ঘটছে। বড় কোনো আলোচনায় আসছে না, নেই তেমন জনসচেতনতা বা জাতীয় পর্যায়ের জরুরি ঘোষণা। অভিভাবকদের অনেকেই জানেন না হামের লক্ষণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, কিংবা কখন হাসপাতালে নিতে হবে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দেরি হয়ে যাচ্ছে—আর সেই দেরির মূল্য দিচ্ছে শিশুদের জীবন।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন—

১. দ্রুত পর্যাপ্ত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

২. দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু করা।

৩. গ্রামাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা।

৪. হাসপাতালগুলোতে শিশুদের জন্য আলাদা প্রস্তুতি নেওয়া।

বিজ্ঞাপন

৫. গণমাধ্যমে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালানো।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই সমন্বিত ও জরুরি পদক্ষেপ না নিলে এই প্রাদুর্ভাব আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। হাম প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগ—কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও টিকার ঘাটতির কারণে সেটিই এখন শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হবে—এটাই সবচেয়ে বড় শঙ্কা।

বিজ্ঞাপন

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD