Logo

নির্ধারিত সময়ের আগেই কলেরা টিকা পেয়ে স্বস্তিতে মানুষ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:২৭
নির্ধারিত সময়ের আগেই কলেরা টিকা পেয়ে স্বস্তিতে মানুষ
ছবি: সংগৃহীত

পানিবাহিত রোগ কলেরা প্রতিরোধে রাজধানীসহ দেশের উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিনামূল্যে মুখে খাওয়ার টিকা দেওয়া শুরু হয়েছে। নির্ধারিত সময়সূচির মধ্যেই প্রথম ডোজ পেয়ে সন্তোষ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে শিশুদের টিকা খাওয়াতে পেরে স্বস্তি পেয়েছেন অভিভাবকেরা।

বিজ্ঞাপন

‘প্রিভেন্টিভ ওরাল কলেরা ভ্যাকসিনেশন ক্যাম্পেইন-২০২৬’-এর আওতায় দুই ধাপে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকার ৫১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষকে কলেরা প্রতিরোধক টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। গর্ভবতী নারী ছাড়া এক বছর বা তার বেশি বয়সী সব নাগরিককে বিনামূল্যে ‘ইউরিকল প্লাস’ নামের এই টিকা দেওয়া হচ্ছে।

আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সহযোগিতায় ২২ আগস্ট থেকে প্রথম ধাপের টিকাদান শুরু হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রথম ডোজ দেওয়ার সময়সীমা ২২ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হবে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ১৪টি ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা ও থানায় এ কর্মসূচি চলছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের লালবাগ, গেন্ডারিয়া, কদমতলী ও কামরাঙ্গীরচর থানার ১৭টি ওয়ার্ডের ১৯২টি কেন্দ্রে প্রায় ১১ লাখ ৭০ হাজার মানুষকে টিকা দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

একইভাবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত ও তেজগাঁও এবং মুন্সিগঞ্জ সদর, কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ, হোসেনপুর ও তাড়াইল, নারায়ণগঞ্জ সদর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও নবীনগর এলাকায়ও টিকাদান চলছে।

গত ২০ আগস্ট কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় কলেরা টিকা দেওয়া হচ্ছে, সেসব এলাকা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর আজিমপুর মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট কেন্দ্রে চার বছর বয়সী মেয়ে নওরিন আক্তার জুঁইকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে আসেন তার মা ফাতেমা আক্তার। তিনি জানান, মেয়ের মাঝে মাঝে পেটের সমস্যা হতো। পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপদ পানি ব্যবহারের বিষয়ে সতর্ক থাকলেও সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হচ্ছিল না।

বিজ্ঞাপন

ফাতেমা আক্তার বলেন, “মাঝে মাঝে মেয়েটার পেটের সমস্যা হতো। সবাই বলতো হাত ধুয়ে খাবার খাওয়াতে। ভালো পানি দিয়ে খাবার রান্না করতে এবং পানি ফুটিয়ে মেয়েকে খাওয়াতে। আসলে এ সবই করতাম, কিন্তু লাভ তেমন একটা হতো না। পেটের সমস্যা লেগেই থাকতো।” বিনামূল্যে কলেরা টিকা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান।

একই কেন্দ্রে আজিমপুর সরকারি কলোনি থেকে দুই বছরের ছেলে অর্ণব সরকারকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে আসেন তার মা পলি সরকার। তিনি বলেন, ছেলেটির সারা বছরই নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা থাকে এবং পেটের সমস্যাও রয়েছে। প্রথম ডোজ দেওয়ার পর দ্বিতীয় ডোজের জন্য আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর আবার কেন্দ্রে আসার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

পলি সরকার বলেন, “ছেলেটার সারা বছর শরীর খারাপ থাকে। সঙ্গে পেটের সমস্যা তো আছেই। ছেলেকে কলেরা টিকার প্রথম ডোজ খাওয়ানো হয়েছে। আগামী মাসের ২৬ তারিখ দ্বিতীয় ডোজ খাওয়াবো।” নির্দিষ্ট সময়ের আগেই এমন উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

টিকাদান কেন্দ্রে কর্মীদের ব্যস্ততাও ছিল চোখে পড়ার মতো। তাহমিনা আক্তার জানান, সকাল থেকেই কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং স্থানীয় মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে এসে নাম নিবন্ধন করে টিকা নিচ্ছেন। প্রথম ডোজ নেওয়ার এক মাস পর দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার জন্য তাদের জানানো হচ্ছে এবং টিকা কার্ডেও বিষয়টি উল্লেখ করে দেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রগুলোতে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় একাধিক কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। একজন নাম নথিভুক্ত করছেন, আরেকজন অনলাইনে নিবন্ধন সম্পন্ন করছেন এবং নিবন্ধন শেষে অন্য একজন টিকা খাওয়াচ্ছেন। পাশাপাশি প্রচারকর্মীরা আশপাশের এলাকায় গিয়ে প্রচারপত্র বিতরণ করছেন এবং কলেরা প্রতিরোধে টিকা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে জানাচ্ছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তেজগাঁও এলাকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের একটি কেন্দ্রে দুই সন্তানকে টিকা খাওয়াতে নিয়ে আসেন আজিজুর রহমান। তার এক সন্তানের বয়স সাত বছর এবং অন্যজনের বয়স সাড়ে তিন বছর।

বিজ্ঞাপন

টিকা দেওয়ার পর আজিজুর রহমান বলেন, “কিছুদিন থেকে ডেঙ্গু ও হাম নিয়ে খুব ভয়ে আছি। এর মধ্যে যদি আবার ডায়রিয়া শুরু হয় তাহলে তো সমস্যা। দুই ছেলেকে কলেরা টিকার প্রথম ডোজ খাওয়াতে পেরে ভালো লাগছে। ভয় অনেকটাই কেটে গেছে।” দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার জন্য আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর আবার কেন্দ্রে আসবেন বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ জানান, বর্তমানে ১৪টি উপজেলায় প্রথম ধাপের টিকাদান চলছে। পর্যায়ক্রমে উচ্চঝুঁকিতে থাকা মোট ১৪৪টি উপজেলায় এই টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দুই ধাপে দেওয়া কলেরা টিকার সুরক্ষা তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় ২৯ লাখ মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হন এবং প্রায় ৯৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষ এখনো এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর বড় অংশ আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থান করছে।

এদিকে আইসিডিডিআর,বি ও কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের গবেষণায় ঢাকায় কলেরার সংক্রমণের ওঠানামার বিষয়টিও উঠে এসেছে। গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ঢাকায় নথিভুক্ত কলেরা রোগীর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১৪১ জন। ২০০৪ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা কমে আসে। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আবারও রোগীর সংখ্যা বাড়তে দেখা যায়।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচিকে কলেরা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যকর খাবার ও পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি টিকাদানের মাধ্যমে জনগোষ্ঠীর ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD